অর্থনীতি

রূপালি ইলিশের গতিপথ পরিবর্তন: গভীর সাগরের দিকে মাইগ্রেশন এবং দেশীয় বাজারে সংকট

নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল:

গবেষকদের আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সত্যি হতে চলেছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও মানবসৃষ্ট নানা সংকটের কারণে উপকূল ছেড়ে গভীর সাগরে পাড়ি জমাচ্ছে আমাদের প্রিয় রুপালি ইলিশ। আর প্রতিবেশী দেশ থেকে নজিরবিহীনভাবে ইলিশ আমদানির ঘটনা দেশের বাজারে এই ইলিশ সংকটের ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তুলেছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বার্ষিক আহরণের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে ইলিশ সংকটের এক উদ্বেগজনক চিত্র ফুটে ওঠে। গত তিন অর্থবছরের তথ্য বলছে, দেশে ইলিশের উৎপাদন ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী। ২০২২-২৩ অর্থবছরে যেখানে ইলিশ আহরণ হয়েছিল ৫ লাখ ৭১ হাজার ৩৪২ টন, সেখানে পরের বছর উৎপাদন কমে যায় ৪১ হাজার ৮৫৫ টন। আর সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন আগের বছরের চেয়ে আরও কমেছে ২৯ হাজার ১৯৯ টন।

ইলিশ কমে যাওয়ার বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক কারণ

জ্যেষ্ঠ ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান জানান, বাংলাদেশের জলসীমানায় সমুদ্র ও অভ্যন্তরীণ নদনদীতে বিগত তিন বছর ধরে ক্রমেই ইলিশ মাছের প্রাপ্যতা কমে আসছে, অনেক জায়গায় তা প্রায় শূন্যের কোটায় নেমেছে।

একই মত প্রকাশ করে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মো. সাজেদুল হক বলেন, “এটি একটি গ্লোবাল প্রবলেম। জলবায়ু উষ্ণতার কারণে ইলিশের জীবনচক্র ব্যাহত হচ্ছে। ইলিশ একটি মাইগ্রেশন বা পরিযায়ী মাছ। পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা এবং প্লাংকটন বা খাদ্যের উপযুক্ত পরিবেশ না পেলে তারা ডিম ছাড়ে না।”

তিনি আরও বলেন, “নদীর গতিপথ পরিবর্তন ও চর পড়ার কারণে ইলিশের বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। মাছগুলো ধীরে ধীরে সাগরের ভেতরের দিকে অর্থাৎ আন্তর্জাতিক সীমানা বা ভারতের কাছাকাছি অঞ্চলে শিফট করছে। এটিকে পপুলেশন ডিনামিকস বলা হয়।”

এছাড়া পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী উল্লেখ করেন, কলকারখানা ও পলিথিনের মাত্রাতিরিক্ত দূষণের কারণেও ইলিশসহ অন্যান্য সামুদ্রিক মাছ উপকূল থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

আমদানির লজ্জা ও ভারতের গুজরাটি ইলিশ

বিশ্বের মোট ইলিশের ৮০ শতাংশের বেশি আহরিত হতো বাংলাদেশে। অথচ সম্প্রতি দেশের বাজার সামাল দিতে ভারতের গুজরাট থেকে প্রায় ৫০০ টন ইলিশ আমদানির নজিরবিহীন ঘটনা ঘটেছে। পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে টনকে টন গুজরাটি ইলিশ বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে।

কুয়াকাটার ৪০ বছরের অভিজ্ঞ জেলে ইউসুফ মাঝি আক্ষেপ করে বলেন, “যাঁরা আমাদের ইলিশের জন্য অধীর আগ্রহে থাকতেন, আজ সেই দেশ থেকেই আমাদের দেশে ইলিশ আসছে। আরব সাগরের এই মাছে আমাদের ইলিশের সেই চিরচেনা স্বাদ নেই।”

অবৈধ ট্রলিং ও মানবসৃষ্ট সংকট

প্রাকৃতিক পরিবর্তনের পাশাপাশি অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ শিকার ইলিশের বংশবৃদ্ধিকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে ফেলছে। সাগরে অবৈধ ট্রলিং বোটের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় জাটকা ও ছোট মাছ নির্বিচারে ধ্বংস হচ্ছে।

মহিপুর থানা মৎস্যজীবী দলের সভাপতি আফজাল মোল্লা অভিযোগ করেন, চট্টগ্রাম, ভোলা ও বাঁশখালীর কিছু অসাধু ট্রলার মালিক কোস্ট গার্ডের কড়াকড়ির কারণে কুয়াকাটা, আলিপুর, মহিপুর ও রাঙ্গাবালী অঞ্চলে অবৈধ ট্রলিং বোট ও ক্ষতিকর ‘নান্দু’ জাল ব্যবহার করে রাত-দিন মাছ শিকার করছেন। এতে সাধারণ জেলেরাও মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

আসন্ন প্রজনন মৌসুম ও করণীয়

আগামী মাসেই শুরু হতে যাচ্ছে ইলিশের প্রধান প্রজনন মৌসুমের ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। গবেষক ড. আনিসুর রহমান সতর্ক করে বলেছেন, জাটকাসহ সব ধরনের ছোট মাছ ধরার অবৈধ জাল ও ট্রলিং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে অচিরেই দেশের মৎস্যভাণ্ডার নিঃশেষ হয়ে যাবে। নিষেধাজ্ঞা কেবল কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment