দৈনিক পূর্বাচল
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশে ধান, গম ও ভুট্টার বাম্পার ফলন হয়েছে এবং সরকারের খাদ্যগুদামেও রয়েছে পর্যাপ্ত মজুদ। তা সত্ত্বেও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় ২ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)। গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত এফএওর গ্লোবাল ইমার্জেন্সি ইনফরমেশন অ্যান্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেমের (জিআইইডব্লিউএস) বাংলাদেশ ব্রিফে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
ঝুঁকিতে ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ
এফএওর পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের প্রায় ১ কোটি ৮১ লাখ মানুষ ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) ফেজ-৩ বা তার বেশি মাত্রার তীব্র খাদ্য সংকটের মুখোমুখি হতে পারে, যা গত মে থেকে আগস্ট সময়ে ছিল প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ। মূলত সংকটটি খাদ্যের অভাব নয়, বরং সাধারণ মানুষের খাদ্য কেনার সামর্থ্য হ্রাসের ফল। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যাকবলিত হয়ে জীবিকা হারানোর ফলে নিম্ন আয়ের মানুষের পাতে পর্যাপ্ত খাবার পৌঁছাচ্ছে না।
সন্তোষজনক কৃষি উৎপাদন ও সরকারি মজুদ
খাদ্য নিরাপত্তার এই আশঙ্কার বিপরীতে দেশের কৃষিখাতের উৎপাদন চিত্র বেশ ইতিবাচক:
-
ধান উৎপাদন: ২০২৬-২৭ মৌসুমে মোট ধান উৎপাদন প্রায় ৬ কোটি ১৯ লাখ টন হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদী গড়ের তুলনায় অন্তত ৫ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বোরো মৌসুমে ৩ কোটি ১৯ লাখ টন, আউশ ৪১ লাখ টন এবং মাঠে থাকা আমন ধানের উৎপাদন ২ কোটি ৫৯ লাখ টন হতে পারে।
-
ভুট্টা ও গম: গত জুলাইয়ে সমাপ্ত মৌসুমে ভুট্টা উৎপাদন প্রায় ৫১ লাখ টন (গত ৫ বছরের গড়ের তুলনায় ১০ গুণ বেশি) এবং এপ্রিলে গম উৎপাদন রেকর্ড প্রায় ১২ লাখ টন হয়েছে।
-
সরকারি মজুদ: খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানম গত ৩ সেপ্টেম্বর সংসদে জানান, গত ৩০ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি গুদামে ২৪ লাখ ৩৭ হাজার ৮০৭ টন খাদ্যশস্য মজুদ ছিল, যা নির্ধারিত নিরাপত্তা মজুদের চেয়েও বেশি।
আমদানিনির্ভরতা ও অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ
খাদ্য উৎপাদন বাড়লেও চাহিদা মেটাতে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা কাটছে না। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৯১ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানির পূর্বাভাস দিয়েছে এফএও। এর মধ্যে গম ৬৮ লাখ টন এবং পশুখাদ্য ও মৎস্য খাতের চাহিদায় ভুট্টা আমদানি প্রায় ১৮ লাখ টনে পৌঁছাতে পারে। তবে চাল আমদানি কমে দাঁড়াতে পারে ৮ লাখ টনে।
খাদ্য নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. গোলাম রসূলের মতে, গুদামে খাদ্য থাকা আর মানুষের চুলায় খাবার পৌঁছানো এক কথা নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপে সাধারণ মানুষের আয় ও মজুরি না বাড়ায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া কক্সবাজার ও ভাসানচরে থাকা প্রায় ১২ লাখ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকের খাদ্য সহায়তায় অর্থের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ভবিষ্যৎ শঙ্কা ও করণীয়
কৃষি খাত বর্তমানে জ্বালানি ও সারের দামের ওপর অত্যন্ত নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের সংকট ও সারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আসন্ন বোরো মৌসুমে উৎপাদন খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। অর্থনীতিবিদদের মতে, কেবল খাদ্য মন্ত্রণালয় নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমন্বয় ও বহুমুখী পদক্ষেপের মাধ্যমেই এই খাদ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা সম্ভব।


