নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক পূর্বাচল
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি ও অস্তিত্বের সংকট নিয়ে বিবিসি-র বিশেষ প্রতিবেদন। এআই গবেষক জ্যাকব কক্সনের আতঙ্ক এবং স্যাম অল্টম্যান ও ইলন মাস্কের নিয়ন্ত্রণের দাবি জানুন দৈনিক পূর্বাচলে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে বিশ্বজুড়ে নতুন সম্ভাবনার উচ্ছ্বাস ও উন্মাদনা তৈরি হওয়ার এই সময়ে প্রযুক্তিটির ভেতর থেকে আসছে একের পর এক গুরুতর সতর্কবার্তা। এআই যত দ্রুত এগিয়ে চলেছে, ততই বাড়ছে মানবজাতির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও কৌতূহল। প্রশ্ন উঠছে—এই অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতির শেষ কোথায় এবং মানুষ কি সত্যিই নিরাপদ?
সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রশ্নগুলোকে আরও তীব্র করে তুলেছেন শীর্ষস্থানীয় এআই গবেষক জ্যাকব কক্সন। অ্যানথ্রপিক থেকে চাকরি ছাড়ার পর এআইয়ের গোপন ঝুঁকি ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া তাঁর একটি পোস্ট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে ব্রিটিশ সম্প্রচারমাধ্যম বিবিসিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি চাঞ্চল্যকর দাবি করেন যে, এআই নিয়ে সরাসরি কাজ করা বহু গবেষক ও প্রকৌশলী প্রযুক্তিটির অতিদ্রুত অগ্রগতি এবং এর সম্ভাব্য ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে ‘সত্যিই আতঙ্কিত’।
‘সবাই মারা যেতে পারি’—কক্সনের চরম আশঙ্কা
মাত্র ২৭ বছর বয়সী তরুণ গবেষক কক্সনের আশঙ্কা অত্যন্ত গুরুতর। তাঁর মতে, বর্তমান অপ্রতিরোধ্য গতিতে এআইয়ের উন্নয়ন ও বিস্তার চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে এবং ‘আমরা সবাই মারা যেতে পারি’, এমন জোরালো ঝুঁকি রয়েছে।
কক্সনের বক্তব্যে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়টি কেবল এআইয়ের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নয়, বরং বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যকার অসুস্থ প্রতিযোগিতা। তাঁর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতায় নেমেছে টেক জায়ান্টগুলো, যার লক্ষ্য কেবল দ্রুততর ও আরও শক্তিশালী এআই মডেল বাজারে আনা। এই কাড়াকাড়িতে অনেক গবেষক ও বিজ্ঞানী নিজেদের চরম এক অসহায় ও আটকে পড়া অবস্থায় দেখছেন।
“এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীরা যখন নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধের কথা বলছেন, তাঁরা বিষয়টি পুরোপুরি গুরুত্ব দিয়েই বলছেন। কারণ তাঁরা এমন একটি প্রতিযোগিতার ভেতর কাজ করছেন, যার সম্ভাব্য পরিণতি নিয়ে তাঁরা নিজেরাই গভীরভাবে আতঙ্কিত।” — জ্যাকব কক্সন, এআই গবেষক
আন্তর্জাতিক সমন্বিত উদ্যোগ ও চীনের অংশগ্রহণ
কক্সনের এই আশঙ্কার সুর একা নয়। তাঁর সাবেক প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিকের প্রধান নির্বাহী দারিও আমোদেই সম্প্রতি এআই উন্নয়নের বর্তমান গতি কমিয়ে আনার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর মতে, প্রযুক্তির লাগাম টেনে ধরার প্রশ্ন না উঠলেও, এর সঙ্গে জড়িত ঝুঁকিগুলো অত্যন্ত গুরুতর এবং তা মোকাবিলায় কোম্পানি ও সরকারগুলোর পর্যাপ্ত সময় প্রয়োজন।
তবে এআই উন্নয়নের গতি কমানোর ক্ষেত্রে ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথাও তুলে ধরেছেন কক্সন। তাঁর মতে, শুধু যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ধীরগতিতে এগোলেই সমাধান হবে না; এর সঙ্গে চীনকেও সমানভাবে এই উদ্যোগের আওতায় আনতে হবে। অন্যথায়, একপক্ষ গতি কমালে অন্য পক্ষ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেবে, যা বৈশ্বিক পর্যায়ে আরও বড় ভূ-রাজনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে।
শীর্ষ নির্বাহীদের অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণের দাবি
শিল্পখাতের ভেতরের এই তীব্র উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে শীর্ষ প্রযুক্তি উদ্যোক্তারাও এখন নিয়মের বেড়াজালের পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছেন। ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এবং এক্সএআইয়ের প্রধান ইলন মাস্ক উভয়েই দারিও আমোদেইয়ের এআই উন্নয়নের গতি নিয়ন্ত্রণ, কঠোর নজরদারি এবং স্বাধীন তদারকি ব্যবস্থার প্রস্তাবের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।
একদিকে বাণিজ্যিক লাভের আশায় আরও শক্তিশালী মডেল তৈরির প্রতিযোগিতা চলছে, অন্যদিকে গবেষকদের একটি দায়িত্বশীল অংশ এর সম্ভাব্য অস্তিত্বগত ঝুঁকি নিয়ে বারবার সতর্কবার্তা উচ্চারণ করছেন।
ভবিষ্যতের বড় প্রশ্ন
এআই মানুষের দৈনন্দিন কাজ সহজ করবে, নাকি একদিন মানবজাতির জন্যই কাল হয়ে দাঁড়াবে—এই বিতর্ক দীর্ঘদিনের। তবে যখন প্রযুক্তি খাতের ভেতরের গবেষকরা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন যে বর্তমান গতির অগ্রগতি মানবজাতির অস্তিত্বকেই বিপন্ন করতে পারে, তখন বিষয়টি আর তাত্ত্বিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ থাকে না।
এখন মূল প্রশ্ন শুধু এটি নয় যে এআই কতটা দ্রুত উন্নত হবে; বরং সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—মানুষ কি শেষ পর্যন্ত সেই অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের গতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার লাগাম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে?
(তথ্যসূত্র: বিবিসি)


