দৈনিক পূর্বাচল
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানীর মিরপুরে একটি ক্লিনিকে সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় করে এক ব্যক্তিকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চাঞ্চল্যকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। তবে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে নিশ্চিত করেছে যে, ওই ঘটনায় জোরপূর্বক অপহরণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
গত কয়েক দিন ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দেখা যায় এক ব্যক্তিকে সাদা বস্তায় ভরে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এই দৃশ্যকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক ও গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে।
এ বিষয়ে মিরপুর বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মোস্তাক আহমেদ গণমাধ্যমকে জানান, “সাদা বস্তায় করে একজনকে নিয়ে যাওয়ার যে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে; সেটি নিয়ে আমরা নিবিড় অনুসন্ধান করেছি। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে প্রাথমিকভাবে অপহরণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আরও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।”
পরিচয় ও ক্লিনিকে কর্মরত থাকার বিবরণ:
পুলিশের অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত ওই ব্যক্তির নাম নজরুল ইসলাম (৫০)। তিনি টাঙ্গাইলের মধুপুর থানার মো. শুকুর আলীর ছেলে। বর্তমানে তিনি রাজধানীর পল্লবী ১১ নম্বর এলাকার ‘দি স্যালভেশন আর্মি’ যক্ষ্মা ও কুষ্ঠ ক্লিনিকে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কর্মরত আছেন। প্রায় ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে তিনি ওই প্রতিষ্ঠানে নাইট গার্ডের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তার মাসিক বেতন ১৭ হাজার টাকা।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নজরুল ইসলামকে কোনো কোনো স্থানে ‘প্রকল্প ব্যবস্থাপক’ হিসেবে দাবি করা হলেও পুলিশের তদন্তে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। তিনি প্রতিষ্ঠানটির নিচতলায় গেটের পাশে একটি ছোট টেবিলে বসে রাত পাহারা দেন এবং সেখানেই রাতে ঘুমান।
সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেছে:
পুলিশ ও ক্লিনিক সূত্রে জানা যায়, গত ১০ সেপ্টেম্বর রাত ১০টার দিকে নজরুল ইসলাম তার নাইট গার্ডের ডিউটিতে যোগ দেন। পরদিন ১১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টার দিকে বদলি গার্ড দানিয়েল সরকার এসে তাকে যথাস্থানে না পেয়ে বিষয়টি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক বোস এলভিন অথিকে জানান। পরবর্তীতে প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ক্যামেরা বা সিসিটিভি ফুটেজ চেক করা হয়।
ফুটেজে দেখা যায়, ১১ সেপ্টেম্বর ভোর ৪টা ৪৭ মিনিটের দিকে অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি একটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তায় নজরুল ইসলামকে ভরে ক্লিনিকের গেটের সামনে এনে রাখেন। এরপর ভোর ৫টা ৪৫ মিনিটের দিকে নজরুল নিজেই ওই বস্তা থেকে সুস্থ অবস্থায় বের হয়ে আসেন। কিছুক্ষণ তাকে গেটের সামনে চুপচাপ বসে থাকতে দেখা যায়। পরবর্তীতে ওই অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির সঙ্গেই একটি রিকশায় চড়ে তিনি ওই স্থান ত্যাগ করেন।
ডিসি মোস্তাক আহমেদ এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, “সিসিটিভি ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে যে তিনি নিজেই বস্তা থেকে বের হয়ে আসছেন। এরপর গেটের সামনে বসে থেকে পরবর্তীতে রিকশায় করে চলেও গেছেন। ফুটেজে জোরজবরদস্তি বা অপহরণের কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি।”
পারিবারিক ও ব্যক্তিগত দিক:
প্রাথমিক অনুসন্ধানে নজরুলের ছেলে মো. মেরাজ (২৬) পুলিশকে জানিয়েছেন, কিছুদিন আগে তার বাবা ব্যাংক থেকে ৩ লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। তার দুই স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে বসবাস করেন। পারিবারিক বা আর্থিক কোনো জটিলতার কারণে তিনি নিজের ইচ্ছায় বা পরিবারের অগোচরে আত্মগোপন করে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে ঠিক কী কারণে বা কোন পরিস্থিতিতে নজরুলকে বস্তায় ভরে ক্লিনিকের সামনে আনা হয়েছিল এবং পরবর্তীতে তিনি ঠিক কোথায় গেছেন—এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি। ঘটনার আসল রহস্য উদঘাটনে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।


