অন্যান্য

আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে বড় অনিয়ম: ৫৪ শতাংশ ঘরই শূন্য ও পরিত্যক্ত

দৈনিক পূর্বাচল প্রতিবেদন ঢাকা:

১১,১৪২ কোটি টাকার আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ ও দুর্নীতির চিত্র। ৫৪% ঘর শূন্য ও পরিত্যক্ত পড়ে থাকায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম দেশের সবচেয়ে বড় গৃহায়ন প্রকল্প।

দেশের প্রায় ৫ লাখ ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের নেওয়া দেশের সবচেয়ে বড় গৃহায়ন কর্মসূচি ‘আশ্রয়ণ-২’ প্রকল্প এখন বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির শিকার। ‘মুজিব শতবর্ষ’ উপলক্ষে ২০২১ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের ব্যয় ৪,৮৪০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ যুগ সংশোধনের পর ১১,১৪২ কোটি টাকায় পৌঁছায়। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে অনিয়মের অনুসন্ধানের মধ্যে প্রকল্পটি বর্তমানে বড় এক আক্ষেপে পরিণত হয়েছে।

মাঠের চিত্র: ৫৪% ঘরই ফাঁকা ও পরিত্যক্ত সম্প্রতি দেশের ১৮ জেলার ৪০টি উপজেলায় ১,৪১৪টি ঘরের ওপর পরিচালিত এক সরেজমিন অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এর মধ্যে ৭৭৫টি ঘরই (৫৪.৮১%) ফাঁকা, তালাবদ্ধ কিংবা পরিত্যক্ত।

  • জনশূন্য ও ভুতুড়ে পরিবেশ: শরীয়তপুরের নড়িয়ার চরআত্রা খাসবাজার প্রকল্পের ১০০ ঘরের ৯০টিই শূন্য। নথিপত্র ও স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, মৌলিক সুবিধা ও যোগাযোগ সংকটের কারণে ঘরগুলোর টিন, দরজা-জানালা ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চুরি হয়ে গেছে। পটুয়াখালীর বাউফলের ছত্রকান্দায় ২১টি পরিত্যক্ত ঘর এখন গোয়ালঘর ও খড় রাখার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। শেরপুরের ভোগাইপাড়ায় ৩০টি ঘরের প্রতিটিতেই তালা ঝুলছে; কাজের সন্ধানে বাসিন্দারা ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে চলে গেছেন।

  • ব্যতিক্রম রাঙামাটি: অন্যান্য এলাকার চিত্র হতাশাজনক হলেও রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে ১১০টি ঘরের সব কটিতেই সুফলভোগীরা বসবাস করছেন। তবে তারাও নিরাপদ পানি, রাস্তা ও ড্রেনেজ সংকটে ভুগছেন।

ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণ ও অব্যবস্থাপনা প্রকল্পের শুরু থেকেই নির্মাণ মান ও সঠিক সম্ভাব্যতা যাচাই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। মেহেরপুরের গাংনীতে নিম্নমানের ইট ও খোয়া ব্যবহারের কারণে ঘরগুলো ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বগুড়ার দুপচাঁচিয়ায় গাছ ভেঙে একটি ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হলেও পরিবারটি মানবেতর জীবনযাপন করছে। এছাড়া খুলনার কয়রায় তিন বছরেও বিদ্যুৎ সংযোগ না মেলা এবং নলকূপ অকেজো থাকার অভিযোগ রয়েছে। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জে নিচু ও প্লাবনপ্রবণ এলাকায় ঘর তৈরির ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই তা পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।

অনিয়ম ও অপরাধের অভয়ারণ্য স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকৃত ভূমিহীনদের বাদ দিয়ে সচ্ছল ও পাকা বাড়ির মালিকদের ঘর বরাদ্দ দেওয়ার বহু অভিযোগ মিলেছে। খুলনার পাইকগাছায় ৩০টি ঘর ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে, জনশূন্য এসব আশ্রয়ণ প্রকল্প এখন মাদক কারবারি, জুয়াড়ি ও বখাটেদের নিরাপদ আড্ডাস্থলে পরিণত হওয়ায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন আশেপাশের বাসিন্দারা।

প্রশাসনের পদক্ষেপ দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা মনে করেন, জীবিকা নির্বাহের সুযোগ, যোগাযোগ এবং সুপেয় পানির ব্যবস্থা না করে তাড়াহুড়ো করে প্রকল্প বাস্তবায়নই এই ব্যর্থতার মূল কারণ। বর্তমানে মাঠ প্রশাসন ফাঁকা ও বেহাত ঘরের তালিকা তৈরি করছে। নীতিমালার বাইরে ঘর বিক্রি বা দখলে রাখার প্রমাণ মিললে বরাদ্দ বাতিল করে প্রকৃত ভূমিহীনদের মাঝে পুনর্বণ্টনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment