বিনোদন

রূপালী পর্দার তিন কাল: সোনালী অতীত, ঘুরে দাঁড়ানো বর্তমান ও আন্তর্জাতিক ভবিষ্যতের সম্ভাবনা

বিনোদনের বিশেষ প্রতিবেদন, দৈনিক পূর্বাচল: বাংলা চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়; এটি বাঙালির সংস্কৃতি, আবেগ ও ঐতিহ্যের এক মহাকাব্যিক আয়না। ১৯৫৬ সালে আব্দুল জব্বার খানের ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণের মাধ্যমে যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা পার করেছে সাত দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ পথপরিক্রমায় দেশীয় চলচ্চিত্র দেখেছে স্বর্ণযুগ, মুখোমুখি হয়েছে চরম বিপর্যয়ের এবং বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে নতুন এক প্রযুক্তি ও বিশ্বায়নের সন্ধিক্ষণে।

১. সোনালী অতীত: নান্দনিক গল্প ও কালজয়ী সৃষ্টির কাল

স্বাধীনতার পূর্বে ও পরবর্তী আশির দশক পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্র অতিক্রম করেছে তার স্বর্ণযুগ। জহির রায়হান, ঋত্বিক ঘটক, সুভাষ দত্ত, খান আতাউর রহমান, আলমগীর কবিরের মতো কিংবদন্তি নির্মাতাদের হাত ধরে চলচ্চিত্র লাভ করেছিল শিল্প ও সাহিত্যের উচ্চ মর্যাদা। ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’, ‘সারেং বৌ’-এর মতো কালজয়ী সৃষ্টি আন্তর্জাতিক আঙিনায় প্রশংসিত হয়েছে।

সেই সময় রাজ্জাক, কবরী, শাবানা, ববিতা, ফারুক, কিংবা পরবর্তী প্রজন্মের সালমান শাহ ও শাবনূরের মতো তারকারা দর্শকের হৃদয়ে রূপকথা তৈরি করেছিলেন। প্রেক্ষাগৃহগুলো ছিল মধ্যবিত্তের সামাজিক ও পারিবারিক বিনোদনের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু।

২. সংকট কাটিয়ে বর্তমান: শাকিব খান, মাল্টিপ্লেক্স ও নতুন তরঙ্গের উত্থান

নব্বইয়ের দশকের শেষভাগ থেকে ২০১০-এর দশক পর্যন্ত অশ্লীলতা, দুর্বল চিত্রনাট্য এবং প্রেক্ষাগৃহের হাহাকারে বাংলা সিনেমা এক ভয়াবহ সংকটে পড়েছিল। বহু একক প্রেক্ষাগৃহ (Single Screen) বন্ধ হয়ে গড়ে ওঠে শপিং মল। তবে গত কয়েক বছরে বাংলা চলচ্চিত্র ফিরে পেয়েছে নতুন প্রাণ।

সূচক অতীত সংকট (২০০০-২০১৫) বর্তমান বাস্তবতা (২০২০-পরবর্তী)
প্রেক্ষাগৃহের ধরন দ্রুত বন্ধ হতে থাকা একক হল দেশব্যাপী আধুনিক মাল্টিপ্লেক্সের সম্প্রসারণ
দর্শকের শ্রেণি সিঙ্গেল স্ক্রিনকেন্দ্রিক নির্দিষ্ট দর্শক পরিবারমুখী মধ্যবিত্ত ও তরুণ প্রজন্ম
নির্মাণশৈলী এনালগ অ্যানালগ ফরম্যাট ও দুর্বল ভিএফএক্স ফোর-কে (4K) প্রযুক্তি, প্রফেশনাল কালার গ্রেডিং ও সাউন্ড
আন্তর্জাতিক বাজার অত্যন্ত সীমিত প্রদর্শনী উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক বাণিজ্য

বর্তমানে শাকিব খানের একক বক্স অফিস আধিপত্য এবং বিশ্বব্যাপী বাণিজ্যিক সফলতার পাশাপাশি রায়হান রাফী, মেজবাউর রহমান সুমন, তানিম রহমান অংশু কিংবা গিয়াস উদ্দিন সেলিমের মতো তরুণ ও অভিজ্ঞ নির্মাতারা শিল্প ও বাণিজ্যের ভারসাম্য রক্ষা করছেন। ‘পরাণ’, ‘হাওয়া’, ‘প্রিয়তমা’, ‘তুফান’-এর মতো ছবিগুলো প্রেক্ষাগৃহে রেকর্ডসংখ্যক দর্শক ফিরিয়ে এনেছে।

৩. ভবিষ্যতের দিগন্ত: ওটিটি প্ল্যাটফর্ম, এআই ও আন্তর্জাতিক বাজার

বাংলা চলচ্চিত্রের ভবিষ্যৎ কেবল দেশের প্রেক্ষাগৃহে সীমাবদ্ধ নেই। বিশ্বায়নের এই যুগে বেশ কিছু মূল উপাদান আগামী দিনের ঢাকাই সিনেমাকে রূপদান করবে:

  • ওটিটি ও গ্লোবাল স্ট্রিমিং: হইচই, চরকি, বিঞ্জসহ আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মগুলো (যেমন নেটফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম) বাংলা সিনেমাকে বিশ্বময় ১৮ কোটি বাংলাভাষীর পাশাপাশি ভিনভাষী দর্শকদের কাছেও পৌঁছে দিচ্ছে।

  • প্রযুক্তি ও ভিএফএক্স (VFX): জেনারেটিভ এআই, উন্নত গ্রাফিক্স ও কালার স্পেসের ব্যবহারে নির্মাণের মান আন্তর্জাতিক স্কেলে উন্নীত হচ্ছে।

  • যৌথ প্রযোজনা ও ওভারসিজ মার্কেট: উত্তর আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যে এখন দেশীয় সিনেমার নিয়মিত মুক্তি বাণিজ্যিকভাবে প্রযোজকদের বড় মূলধন ফিরিয়ে দিচ্ছে।

তবে ভবিষ্যৎকে আরও টেকসই করতে জেলা পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক প্রজেকশন সম্বলিত মিনি-মাল্টিপ্লেক্স নির্মাণ এবং চলচ্চিত্র প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment