অর্থনীতি

পাট-চামড়ার পর এবার টার্গেট গার্মেন্টস? পোশাক শিল্প ধ্বংসের নেপথ্যে গভীর ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল
ঢাকা, ৫ নভেম্বর ২০২৬
পাট ও চামড়া শিল্পের পর এবার কি দেশের প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক (RMG) শিল্পকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে?
বর্তমানে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সহিংসতাকে সাধারণ কোনো আন্দোলন হিসেবে দেখছেন না অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট খাতের অংশীজনেরা। তাদের অভিযোগ, অতীতে যেভাবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী পাট শিল্প ও সম্ভাবনাময় চামড়া শিল্পকে সুকৌশলে ধ্বংস করে প্রতিবেশী ভারতের বাজারের একচেটিয়া সুবিধা করে দেওয়া হয়েছিল, ঠিক একই কায়দায় এবার গার্মেন্টস শিল্পকে ধ্বংসের পাঁয়তারা চলছে। আর এই ধ্বংসাত্মক খেলায় মাঠ পর্যায়ে উসকানি দিচ্ছে পতিত আওয়ামী লীগের একটি স্বার্থান্বেষী মহল।
শিল্পের পিঠে নতুন আঘাত: পাট ও চামড়ার পুনরাবৃত্তি?
বিশ্লেষকদের মতে, একসময় বাংলাদেশের সোনালী আঁশ খ্যাত পাট শিল্প বিশ্ববাজারে রাজত্ব করত। পরবর্তীতে নানা আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটচালের কারণে দেশের পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে যায়, যার সরাসরি সুফল ভোগ করে ভারত। একই চিত্র দেখা গেছে চামড়া শিল্পের ক্ষেত্রেও। হাজারীবাগ থেকে সাভারে ট্যানারি স্থানান্তরের দীর্ঘসূত্রিতা এবং পরিবেশগত সার্টিফিকেশনের মারপ্যাঁচে ফেলে বাংলাদেশের কাঁচা চামড়ার বাজারকে প্রায় পঙ্গু করে দেওয়া হয়, যার ফলে দেশের চামড়া অবিক্রীত থেকে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে ভারতের বাজারে।
এবার একই ফর্মুলায় বাংলাদেশের মূল অর্থনৈতিক স্তম্ভ, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয়, সেই তৈরি পোশাক শিল্পকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে। ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে বাংলাদেশ যখন শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে, ঠিক তখনই পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতনের দাবিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একদল বহিরাগত ও মুখোশধারী শ্রমিক সেজে কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটাচ্ছে।
নেপথ্যে ভারত ও আওয়ামী লীগের যৌথ ইন্ধনের অভিযোগ
রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, চলমান এই শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে সাধারণ শ্রমিকদের যৌথ চাহিদার চেয়ে ভূরাজনৈতিক স্বার্থ বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, ভারতের কিছু নীতি-নির্ধারক ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক অর্ডারগুলো নিজেদের দেশে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ঠিক এই সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে দেশে অরাজকতা তৈরি করতে মাঠে নেমেছে ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারিয়ে দিশেহারা আওয়ামী লীগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ব্যর্থ প্রমাণ করতে এবং দেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিতে শ্রমিকদের আবেগকে ব্যবহার করে এই আন্দোলনকে সহিংস রূপ দিচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্তেও বেরিয়ে এসেছে যে, সাভার, আশুলিয়া ও গাজীপুরের একাধিক স্পটে যারা কারখানায় ইটপাটকেল ছুড়েছে এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর হামলা করেছে, তাদের অনেকেই মূলত বহিরাগত এবং নিষিদ্ধ কিংবা পতিত রাজনৈতিক দলটির সঙ্গে যুক্ত।
বিপর্যস্ত অর্থনীতি ও ক্রেতাদের উদ্বেগ
এই কৃত্রিম সংকটের কারণে গত কয়েকদিনে শত শত পোশাক কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে, যার ফলে বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডগুলোর বসন্ত ও গ্রীষ্মকালীন পোশাকের বিশাল চালান সময়মতো পাঠানো নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিজিএমইএ এবং বিকেএমইএ-র নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, যদি এখনই এই পরিকল্পিত উসকানি বন্ধ করা না যায়, তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে ভারত বা ভিয়েতনামের দিকে চলে যাবে। আর এটিই হচ্ছে এই আন্দোলনের পেছনের কুশীলবদের মূল লক্ষ্য।

সরকার ইতোমধ্যে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নির্ধারণের জন্য ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে এবং নতুন কাঠামো আগামী ডিসেম্বর থেকে কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধুমাত্র মজুরি বৃদ্ধিই এই সমস্যার সমাধান নয়; বরং শিল্পের ভেতরের “কালো হাত” ও বিদেশী ইন্ধনদাতাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। দেশীয় শিল্প রক্ষা এবং লাখ লাখ শ্রমিকের রুটি-ルーজি বাঁচিয়ে রাখতে দেশের জনগণকে এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন দেশের সচেতন মহল।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment