অর্থনীতি

ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণে শত শর্ত, বড় খেলাপিদের জন্য বিশেষ ছাড়: ব্যাংক খাতের বৈষম্য | দৈনিক পূর্বাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক পূর্বাচল

ঢাকা, ২ নভেম্বর ২০২৬:

ব্যাংক ঋণে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পদে পদে ভোগান্তি আর বড় খেলাপিদের জন্য বিশেষ ছাড়ের চিত্র নিয়ে দৈনিক পূর্বাচলের বিশেষ প্রতিবেদন। বিস্তারিত পড়ুন।

ব্যাংক খাতের ঋণ বিতরণে নীতিমালার চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন দেশের প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা। ট্রেড লাইসেন্স, তিন গ্যারান্টার এবং বিআইএনসহ (BIN) নানা কঠোর শর্তের বেড়াজালে যখন ছোট ব্যবসায়ীরা ঋণবঞ্চিত হচ্ছেন, ঠিক তখনই হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ থাকা বড় শিল্প গ্রুপগুলোকে বিশেষ ছাড়ে নতুন ঋণের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প খাতের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি আর্থিক খাতে তৈরি হচ্ছে এক ধরনের বৈষম্যমূলক সংস্কৃতি।

ছোটদের জন্য কড়াকড়ি, দালালের শরণাপন্ন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

গাজীপুরের টঙ্গীর ক্ষুদ্র ঝুট ব্যবসায়ী রবিউল মিয়া সম্প্রতি সিটি ব্যাংক থেকে ৫ লাখ টাকার ঋণের জন্য আবেদন করেছিলেন। ব্যবসার ট্রেড লাইসেন্সসহ সব কাগজপত্র জমা দিলেও গ্যারান্টার ও বিভিন্ন শর্ত পূরণের জটিলতায় তাকে ঋণ দেওয়া হয়নি। শেষ পর্যন্ত দালালের শরণাপন্ন হলে আগের কাগজপত্রে কোনো জটিলতা ছাড়াই ঋণ ছাড় হয়, তবে এজন্য গুনতে হয় বাড়তি ঘুষ।

রবিউলের মতো দেশের প্রায় সব ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারই একই অভিজ্ঞতা। অথচ ছোটদের ক্ষেত্রে সামান্য বকেয়া বা কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থতার কারণে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হয়। পাবনার ঈশ্বরদীর রহিমা বেগম মাত্র ৯০০ টাকা বকেয়ার দায়ে এবং অন্য এক কৃষক মাত্র ৪০০ টাকা খেলাপি হওয়ার দায়ে কারাবাসের শিকার হয়েছেন। এমনকি তাদের কোমরে দড়ি বেঁধে জেলে পাঠানোর মতো অমানবিক ঘটনার নজিরও রয়েছে। সিএমএসএমই (CMSME) খাতের উদ্যোক্তারা সাধারণত নিয়মিত কিস্তি পরিশোধ করলেও তাদের ওপরই চালানো হয় নানামুখী আইনি কড়াকড়ি।

বড়দের জন্য বিশেষ ছাড় ও ঋণ পুনঃতফসিল

এর বিপরীত চিত্র দেখা যায় বড় বড় শিল্প গ্রুপগুলোর ক্ষেত্রে। ব্যাংক খাতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৫ হাজার শিল্প গ্রাহকের কাছে রয়েছে প্রায় ৬ লাখ কোটি টাকার ঋণ, যা মোট ঋণের ৩৩ শতাংশ। এস আলম ও বেক্সিমকোর মতো শীর্ষ খেলাপি গ্রুপগুলো লাখ লাখ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থাকে চরম সংকটে ফেললেও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

বহুল আলোচিত এস আলম গ্রুপ ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়ে শীর্ষ খেলাপির তালিকায় থাকলেও, গত আগস্টে প্রতিষ্ঠানটির এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডের এলসি খোলার বিশেষ অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একইভাবে খেলাপি হওয়ার পরও বেক্সিমকো এলপিজি ইউনিট-১ ও শাইনপুকুর সিরামিকসকে বিশেষ ক্ষমতায় নতুন ঋণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। নামমাত্র ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ১৫ বছর পর্যন্ত ঋণ নিয়মিত দেখানোর বিশেষ সুবিধাও ভোগ করছেন এই বড় উদ্যোক্তারা।

পরিসংখ্যান যা বলছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কৃষক ও ক্ষুদ্র ঋণগ্রহীতাদের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা হয়েছে ১ লাখ ১ হাজার ১২৩টি, যেখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ মাত্র ৩৯৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে, এসএমই ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে— দেশে ১ কোটি ১৭ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তার প্রায় ৭৭ শতাংশই আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং খাতের বাইরে রয়েছেন। সরাসরি ব্যাংকঋণ পান মাত্র ৯ শতাংশ উদ্যোক্তা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সংবাদমাধ্যমকে জানান, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের লজিস্টিক সাপোর্ট কম থাকায় তারা ঋণ পেতে কিছুটা সমস্যায় পড়েন, তবে এই খাতের উদ্যোক্তারাই ঋণ ফেরতে সবচেয়ে বেশি এগিয়ে থাকেন। অন্যদিকে দেশের বৃহৎ অর্থনীতি সচল রাখতে বড় শিল্প গ্রুপগুলোকে কিছু নীতিগত সুবিধা দেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের টেকসই উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে হলে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ উভয় খাতের জন্যই সমান নীতি এবং স্বচ্ছতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment