বিনোদন

অধ্যক্ষ মোঃ বিল্লাল হোসেন : শিক্ষার আলো থেকে সাহিত্যের ভুবনে

দৈনিক পূর্বাচল

 

ভোরের প্রথম আলো যখন পূর্বাচলের দিগন্ত ছুঁয়ে ধীরে ধীরে শহরকে জাগিয়ে তোলে, তখনই শুরু হয় অধ্যক্ষ মোঃ বিল্লাল হোসেনের দিন। এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চা, পাশে কয়েকটি প্রিয় বই, পুরোনো ডায়েরি আর একটি ঝরনা কলম—এই সামান্য আয়োজনেই তিনি খুঁজে নেন নিজের একান্ত পৃথিবী। কর্মব্যস্ত জীবনের কোলাহল থেকে দূরে দিনের অন্তত কিছুটা সময় তিনি নিজেকে সমর্পণ করেন সাহিত্য ও সৃজনশীল চিন্তার কাছে।

শিক্ষকতা তাঁর কাছে শুধু জীবিকা নয়; মানুষ গড়ার একটি নৈতিক দায়িত্ব। দীর্ঘ শিক্ষকতা ও শিক্ষাপ্রশাসনের জীবনে তিনি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শ্রেণিকক্ষে পাঠদান থেকে শুরু করে একটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক পরিচালনা—শিক্ষাক্ষেত্রের নানা স্তরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তাকে করেছে বাস্তবমুখী ও জীবনঘনিষ্ঠ।

তাঁর বিশ্বাস, একটি ভালো শিক্ষা মানুষের মেধাকে বিকশিত করে, কিন্তু মূল্যবোধ তাকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। তাই শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও দেশপ্রেমের শিক্ষা দেওয়াকে তিনি সবসময় গুরুত্ব দিয়েছেন।

এই দীর্ঘ কর্মজীবনের পাশাপাশি তাঁর আরেকটি নীরব পরিচয়—তিনি একজন কবি ও সাহিত্যপ্রেমী। পেশাগত দায়িত্ব যতই থাকুক, কবিতার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি। বরং জীবনের অভিজ্ঞতা যত গভীর হয়েছে, তাঁর কবিতার বিষয়ও তত বিস্তৃত হয়েছে।

প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজ—এই তিনের কাছ থেকেই তিনি তাঁর লেখার প্রধান উপাদান সংগ্রহ করেন। গ্রামের মেঠোপথ, নদীর ভাঙন ও গড়ন, বর্ষার জল, শরতের আকাশ, শীতের কুয়াশা কিংবা মাটির মানুষের নীরব জীবনসংগ্রাম—সবকিছুই তাঁর অনুভূতির জগতে এসে কবিতার ভাষা পায়।

তবে তাঁর কবিতা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যে থেমে থাকে না। সময়ের অসঙ্গতি, অন্যায়, বৈষম্য, বঞ্চনা, ক্ষমতার অপব্যবহার, মানুষের প্রতি মানুষের অবহেলা এবং বিবেকের সংকটও তাঁর লেখায় জায়গা করে নেয়। তিনি বিশ্বাস করেন, সাহিত্য কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; সাহিত্য মানুষের বিবেককে প্রশ্ন করতে পারে, অন্ধকারের দিকে আলো ফেলতে পারে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠতে পারে।

তাঁর লেখার টেবিলটি খুব সাধারণ। কিন্তু সেই টেবিলেই প্রতিদিন জন্ম নেয় নানা ভাবনা। কখনো একটি শব্দ তাঁকে দীর্ঘক্ষণ ভাবায়, কখনো কোনো দৃশ্য মনের মধ্যে একটি পংক্তির জন্ম দেয়। কোনো সাধারণ মানুষের জীবনের অসাধারণ সংগ্রামও তাঁর কাছে হয়ে ওঠে কবিতার বিষয়। একটি নদীর ভাঙন তাঁর কাছে শুধু ভৌগোলিক পরিবর্তন নয়—তার মধ্যে তিনি দেখতে পান মানুষের হারিয়ে যাওয়া ঘর, স্মৃতি ও স্বপ্নের গল্প।

সাহিত্য তাঁর কাছে আত্মপ্রকাশের পাশাপাশি আত্মশুদ্ধিরও একটি পথ। দিনের ব্যস্ততা, মানুষের সঙ্গে নানা অভিজ্ঞতা এবং জীবনের পাওয়া-না-পাওয়াগুলো তিনি কখনো ডায়েরির পাতায়, কখনো কবিতার পঙ্‌ক্তিতে ধরে রাখেন। তাই তাঁর লেখায় ব্যক্তিগত অনুভূতির সঙ্গে মিশে যায় বৃহত্তর সমাজ ও মানুষের প্রতি দায়বোধ।

তাঁর জীবনদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি সহজ বিশ্বাস—মানুষের পদমর্যাদা নয়, তার কর্মই তাকে মূল্যবান করে তোলে। একজন মানুষ কত বড় পদে ছিলেন, তার চেয়ে তিনি কতটা মানুষের উপকার করেছেন, কতটা ভালো চিন্তার জন্ম দিয়েছেন এবং সমাজের জন্য কতটুকু ইতিবাচক অবদান রেখেছেন—সেটিই তাঁর কাছে বড় হয়ে ওঠে।

এই কারণেই শিক্ষা ও সাহিত্য তাঁর জীবনে দুটি আলাদা পথ নয়। একটি পথ মানুষকে জ্ঞান দেয়, অন্যটি মানুষকে অনুভব করতে শেখায়। একটি মেধাকে জাগায়, অন্যটি বিবেককে। আর এই দুই পথের সমন্বয়েই তিনি নিজের জীবনকে এগিয়ে নিতে চান।

অধ্যক্ষ মোঃ বিল্লাল হোসেন এখনো পথের যাত্রী। তাঁর সামনে রয়েছে শিক্ষা নিয়ে আরও কিছু করার স্বপ্ন, সমাজকে নিয়ে কিছু ইতিবাচক উদ্যোগের আকাঙ্ক্ষা এবং কলমের মাধ্যমে মানুষের কথা বলার প্রত্যয়। তিনি মনে করেন, জীবন যতদিন আছে, শেখারও ততদিন শেষ নেই; আর মানুষের জন্য ভালো কিছু করার ইচ্ছারও কোনো অবসর নেই।

তাঁর কলম তাই থেমে থাকুক না। সেখানে উঠে আসুক মাটির মানুষের কথা, নদীর কথা, প্রকৃতির কথা, সময়ের কথা এবং মানুষের বিবেকের কথা। শিক্ষা ও সাহিত্যের এই দ্বৈত সাধনায় তাঁর পথচলা আরও সমৃদ্ধ হোক—এই প্রত্যাশাই তাঁর সুহৃদ, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের।

শিক্ষার আলোয় মানুষ গড়া এবং সাহিত্যের আলোয় বিবেক জাগানো—এই দুই স্বপ্ন নিয়েই অধ্যক্ষ মোঃ বিল্লাল হোসেনের নিরন্তর পথচলা।

 

 

দেশমাতার আবেদন
বেলাল

আমি দেশমাতা —
আমার শরীর জুড়ে একদিন
ভয়ের বাতাস বয়ে গিয়েছিল।
রাস্তা, নদী, আদালত, ঘর—
সবখানে তখন
নীরবতার পাহারা।

সে দিন রাষ্ট্রের হাত
কিছু শক্ত কব্জার দখলে ছিল,
সে দিন আমার সন্তানেরা
শ্বাস নিতে ভয় পেত।
আমাদের ঘরেও
অত্যাচারের ছায়া পড়েছিল—
আমি দেখেছি,
আমি ভুলিনি।

কিন্তু শোনো,
আমি আর সেই দিন চাই না।
প্রতিহিংসার রক্তচক্রে
আমার সন্তানেরা ঘুরপাক খাক—
এ দৃশ্য আমি সহ্য করি না।

প্রতিহিংসার ঋতু পেরিয়ে
এবার ন্যায়ের বসন্ত আনো;
এক প্রজন্মের অশ্রু
আরেক প্রজন্মের উত্তরাধিকার
হয়ে থাকুক—এ আমি চাই না।
ঘৃণার বীজে
কোনো দেশের ফুল ফোটে না।

নির্বাচনে-
আমার সন্তানেরা
ভোটের বাক্সে শুধু কাগজ ফেলেনি—
ফেলেছিল বিশ্বাস,
ফেলেছিল রাষ্ট্র চালানোর ভার।
আঙুলের কালিতে
তারা লিখেছিল একটি চুক্তি।

সে চুক্তি ভাঙো না।

আমি মা—
আমি সন্তান বিমুখ হলে কাঁদি।
মনে রেখো,
বিজয় মানে শুধু পতাকা নয়,
রাজপথের উল্লাস নয়—
বিজয় মানে
আইনের মুখে ভয়ের মৃত্যু।
বিজয় মানে
দুর্বল ঘুমোতে পারে নিশ্চিন্তে।

আমার শরীরে যেন আর
হঠাৎ বজ্রপাত না নামে—
নামের পাশে মিথ্যা দাগ বসিয়ে
কেউ যেন অদৃশ্য হয়ে না যায়।
আইন হোক সকালের রোদ,
রাতের ছায়া নয়।

আমি চাই না
বিচারালয় হয়ে উঠুক হাট,
যেখানে ন্যায়ের দাম হাঁকা হয়।
কলম চলুক বিবেকে,
লেনদেনে নয়।

কারাগার হোক অপরাধীর,
স্বপ্নবান সন্তানের নয়।
লোহার শিক যেন
নির্দোষের কণ্ঠে ক্ষত না তোলে।

দলীয় রঙে
আমার শাড়ি রাঙিও না।
ক্ষমতার লাঠি দিয়ে
দুর্বলের উঠোনে ঝড় তুলতে দিও না।
এই দিকে রেখো
তোমার কঠোর দৃষ্টি।

আমার ভোল্ট যেন
রাতের নিঃশ্বাসে কাঁপে না।
অদৃশ্য হাত
সংখ্যা গুনে বিদেশে পালাক—
এ আমি চাই না।
আমার সঞ্চয় থাকুক
আমার ঘামের পাহারায়।

বাজারে যেন আর
কাগুজে আগুন না লাগে।
শেয়ারের নামে
স্বপ্ন লুটের উৎসব বন্ধ হোক।

দুর্নীতির গাছে
পাতা ছেঁড়ো না,
শিকড়ে আঘাত করো।
কালো টাকার ডানা ভেঙে দাও—
আমার রক্ত
বিদেশের ভল্টে আশ্রয় নেবে না।

ইশতেহার যেন
দেয়ালে ঝুলে থাকা রঙিন কাগজ না হয়।
প্রতিশ্রুতি নামুক
স্কুলের বেঞ্চে,
হাসপাতালের শয্যায়,
কৃষকের হাতে,
শ্রমিকের ঘামে।

আমি কোনো ব্যক্তিগত খনি নই।
আমি মানুষের ঘর।
আমার বুক থেকে যেন আর
রক্ত না যায়,
ধন না যায়,
ভবিষ্যৎ না যায়।

আমার তরুণেরা আজ
পাসপোর্টের পাতা ওলটায়—
চোখে দূর দেশের মানচিত্র।
কাজ নেই বলে,
নিরাপত্তা নেই বলে।
এমন দেশ কোরো না,
যেখান থেকে মেধা পালায়।

আমাকে এমন করে গড়ো—
যেখানে কাজ জন্ম নেয়,
স্বপ্ন দাঁড়ায় মাথা উঁচু করে।
যেখানে তরুণ বলে—
এই দেশেই আমার ভবিষ্যৎ।

আমি চাই
নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য বাংলাদেশ।
বেকারত্ব নামুক,
সম্ভাবনা উঠুক।

আজ আমি তাকিয়ে আছি—
একটি শব্দের দিকে,
একটি শাসনের দিকে।
সুশাসন—
যা থাকবে না শুধু ভাষণে,
থাকবে আমার সন্তানের
সকালের রুটিতে,
রাতের নিশ্চিন্ত ঘুমে।

তাই বলছি—
আমার ক্ষতকে প্রতিশোধের অস্ত্র করো না;
আর বিজয়কে ব্যক্তির সম্পত্তি বানিও না।

কারণ ক্ষমতার ঊর্ধ্বে
একটি শব্দ দাঁড়িয়ে থাকে—

জনতা।

আর জনতারও ওপরে
নির্লিপ্ত যে বিচার,
তার নাম—

ইতিহাস।

এই আমার আবেদন—
কোনো দিনের ক্রোধ নয়,
কোনো দলের ভাষা নয়;
এ আমার বুকের গভীর থেকে ওঠা
এক মায়ের প্রার্থনা—

আমার সন্তানরা যেন
এমন একটি বাংলাদেশ পায়,
যেখানে ন্যায় ভয় পায় না,
সত্য নির্বাসিত হয় না,
ক্ষমতা মানুষের মাথার ওপর
ছায়া হয়ে থাকে—
বোঝা হয়ে নয়।

এই আমার আবেদন—
শেষ কথা নয়;

এ আমার
চিরন্তন প্রার্থনা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment