সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক | দৈনিক পূর্বাচল
ঢাকা, ৫ নভেম্বর ২০২৬
দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা এবং গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী সমাধান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে ‘রুফটপ সোলার’ বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ। বিশেষ করে দেশের পর্যটন ও আতিথেয়তা (Hospitality) খাতে—যেমন হোটেল, রিসোর্ট এবং বড় বড় রেস্তোরাঁগুলোতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার আগামী দিনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে।
এই প্রসঙ্গে দেশের বিশিষ্ট হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম দৈনিক পূর্বাচলকে বলেন, “বর্তমানে হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায় সবচেয়ে বড় খরচের খাতগুলোর একটি হলো বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ বিল। সেন্ট্রাল এসি, বড় ফ্রিজার এবং লাইটিংয়ের কারণে প্রতি মাসেই বিশাল অঙ্কের বিল পরিশোধ করতে হয়। এই পরিস্থিতিতে রুফটপ সোলার বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ কেবল আমাদের বিদ্যুৎ বিলই কমাবে না, বরং জাতীয় গ্রিডের ওপর থেকেও বড় ধরনের চাপ কমাতে সাহায্য করবে।”
কেন হোটেল-রেস্তোরাঁয় রুফটপ সোলার ব্যবহার জরুরি?
১. বিদ্যুৎ বিলের বিশাল সাশ্রয়:
ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের মতে, ছাদে সোলার প্যানেল বসিয়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের একটি বড় অংশ উৎপাদন করা সম্ভব। এর ফলে মূল গ্রিডের ওপর নির্ভরতা কমে এবং মাসিক বিদ্যুৎ বিল প্রায় ৩০% থেকে ৫০% পর্যন্ত হ্রাস পায়, যা ব্যবসাকে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক করে তোলে।
২. নেট মিটারিংয়ের চমৎকার সুবিধা:
বাংলাদেশ সরকারের স্রেডা (SREDA) নেট মিটারিং নীতিমালার আওতায় হোটেলগুলো দিনে সোলার থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করতে পারে। রাতের বেলা যখন সোলার কাজ করবে না, তখন গ্রিড থেকে নেওয়া বিদ্যুতের দামের সাথে দিনে দেওয়া বিদ্যুৎ সমন্বয় (Adjust) করা হয়। এটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অত্যন্ত লাভজনক।
৩. লোডশেডিংয়ে জেনারেটরের বিকল্প ও জ্বালানি খরচ হ্রাস:
গ্রিড বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় জেনারেটর চালাতে প্রচুর ডিজেল বা গ্যাস খরচ হয়। রুফটপ সোলারের সাথে হাইব্রিড ইনভার্টার ও ব্যাটারি ব্যাকআপ ব্যবহার করলে লোডশেডিংয়ের সময়ও নিরবচ্ছিন্নভাবে লাইট, ফ্যান ও এসি চালানো যায়, যা বাড়তি জেনারেটরের জ্বালানি খরচ বাঁচায়।
৪. ‘গ্রিন ট্যুরিজম’ ও ব্র্যান্ড ভ্যালু বৃদ্ধি:
বর্তমান যুগে বিশ্বজুড়ে পরিবেশবান্ধব বা ‘Eco-friendly’ হোটেলের চাহিদা বাড়ছে। যে সব হোটেল বা রেস্তোরাঁ নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে, সচেতন গ্রাহক ও পর্যটকরা সেগুলোকে বেশি প্রাধান্য দেন।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা: ২০৩০ সালের মহাপরিকল্পনা
বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের অন্তত ২০% নবায়নযোগ্য শক্তির উৎস থেকে মেটানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। ব্যবসায়ী মহলের মতে, হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাত যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে রুফটপ সোলারে বিনিয়োগ করে, তবে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও সহজ হবে। ভবিষ্যতে এই খাতে যেসব পরিবর্তন আসতে পারে:
  • বাধ্যতামূলক গ্রিন এনার্জি নীতি: পরিবেশের সুরক্ষায় ভবিষ্যতে বড় বাণিজ্যিক ভবন ও থ্রি-স্টার বা ফাইভ-স্টার হোটেলের জন্য মোট চাহিদার একটি নির্দিষ্ট অংশ সোলার থেকে নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হতে পারে।
  • ইভি চার্জিং স্টেশন: রুফটপ সোলারের সাহায্যে হোটেলগুলো তাদের পার্কিং লটে ইলেকট্রিক গাড়ি (EV) চার্জিং স্টেশন তৈরি করতে পারবে, যা গ্রাহকদের আকৃষ্ট করার নতুন একটি মাধ্যম হবে।

দৈনিক পূর্বাচলের শেষ কথা:
ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের মতো দেশের অন্যান্য হোটেল ও রেস্তোরাঁ মালিকদেরও এখন রুফটপ সোলারের মতো সবুজ প্রযুক্তির দিকে এগিয়ে আসা উচিত। সরকারের উচিত এই খাতে সোলার যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক ছাড় এবং সহজ শর্তে গ্রিন লোনের (Green Loan) ব্যবস্থা করা, যাতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরাও সহজে এই প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারেন।