বিশেষ প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল:
বাজারে পুষ্টির চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত প্রতারণার শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে দেশি মুরগির ডিমের চড়া দামকে পুঁজি করে ডিমের বাজারে জালিয়াতির এক নতুন ফন্দি এঁটেছে অসাধু চক্র। খামারে উৎপাদিত কম দামি ‘সোনালী মুরগির ডিম’ হুবহু দেশি ডিমের মতো দেখতে হওয়ায়, সেগুলোকে ‘খাঁটি দেশি ডিম’ বলে চড়া দামে বিক্রি করা হচ্ছে। ঢাকা সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের খুচরা ও পাইকারি বাজারে এই অভিনব জালিয়াতি এখন ওপেন সিক্রেট। সম্প্রতি জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের (DNCRP) নিয়মিত অভিযানেও এই প্রতারণার প্রমাণ মিলেছে।
চতুরতার আড়ালে অতিরিক্ত মুনাফা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাজারে সাধারণ ফার্মের ডিমের চেয়ে দেশি মুরগির ডিমের প্রতি ক্রেতাদের আকর্ষণ ও ভরসা সবসময়ই বেশি। আর এই সুযোগটিই লুফে নিচ্ছে এক শ্রেণির অতি-লোভী ব্যবসায়ী। পাইকারি বাজারে সোনালী মুরগির ডিমের দাম সাধারণ ডিমের কাছাকাছি হলেও, সেটিকে যখন ‘দেশি’ তকমা দেওয়া হয়, তখন তার দাম রাতারাতি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। অনেক বিক্রেতা আবার প্লাস্টিকের ক্যারেট বা কাঠের খাঁচায় ডিমগুলো এমনভাবে সাজিয়ে রাখেন, যাতে ক্রেতারা এটিকে গ্রামের গৃহস্থের বাড়ি থেকে আসা আসল দেশি ডিম বলেই ভুল করেন।
ভোক্তা অধিকারের কড়া নজরদারি ও জরিমানা
ডিমের বাজারে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধে মাঠে নেমেছে প্রশাসন। সম্প্রতি রাজধানীর শান্তিনগর বাজারে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের একটি তদারকি টিম বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে। সেখানে দেখা যায়, এক ডিম বিক্রেতা সোনালী মুরগির ডিমকে দেশি ডিম হিসেবে প্রদর্শন করে ক্রেতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত মূল্য হাতিয়ে নিচ্ছিলেন। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ওই ব্যবসায়ীকে তাৎক্ষণিকভাবে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এই সিন্ডিকেটটি শুধু রাজধানীতেই সীমাবদ্ধ নেই, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বাজারগুলোতেও তারা ডালপালা মেলেছে। তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং ক্রেতাদের স্বার্থ রক্ষায় এই ধরণের ঝটিকা অভিযান দেশজুড়ে আরও জোরদার করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ক্ষুব্ধ ক্রেতাসাধারণ
বাজার করতে আসা সাধারণ ক্রেতারা এই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কারওয়ান বাজারে ডিম কিনতে আসা গৃহিণী সুলতানা রাজিয়া বলেন, “বাচ্চাদের পুষ্টির কথা ভেবে কষ্ট করে বেশি টাকা দিয়ে দেশি ডিম কিনি। কিন্তু এখন শুনছি বাজারের বেশির ভাগ দেশি ডিমই আসলে সোনালী মুরগির ডিম। সাধারণ মানুষের সরলতা নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলার কোনো মানে হয় না। প্রশাসনের উচিত এদের কঠোর শাস্তি দেওয়া।”
আসল দেশি ডিম চেনার কিছু সহজ উপায়
প্রাণিসম্পদ গবেষক ও বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, একটু সতর্ক হলেই এই জালিয়াতি ধরে ফেলা সম্ভব:
- অনিয়মিত আকার: আসল দেশি মুরগির ডিমের আকার কখনো নিখুঁত বা সবগুলোর সাইজ একই রকম হয় না। কোনোটি ছোট, কোনোটি মাঝারি কিংবা একটু লম্বাটে হতে পারে। কিন্তু খামারের সোনালী ডিমগুলো মেশিনে বাছাই করার মতো প্রায় একই মাপের হয়ে থাকে।
- খোসার টেক্সচার: দেশি ডিমের খোসা কিছুটা খসখসে বা প্রাকৃতিক দাগযুক্ত হতে পারে। অন্যদিকে, সোনালী মুরগির ডিমের খোসা অনেক বেশি মসৃণ, নিখুঁত ও চকচকে দেখায়।
- পরিমাণ ও সরবরাহ: দেশি মুরগির উৎপাদন সীমিত। তাই কোনো দোকানে যদি একসাথে শত শত বা হাজার হাজার ‘দেশি ডিম’ স্তূপ করে রাখা দেখেন, তবে শুরুতেই ধরে নিতে পারেন সেখানে গড়মিল আছে।
প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান
সচেতন মহল মনে করছেন, শুধু মাঝেমধ্যে জরিমানা করে এই বিশাল সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব নয়। দৈনিক পূর্বাচলের পক্ষ থেকে সচেতন নাগরিকরা দাবি তুলেছেন, প্রতি স্তরের ব্যবসায়ীদের জন্য ডিমের জাত বা ক্যাটাগরি সুনির্দিষ্ট করে মূল্য তালিকা ঝুলিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে প্রতারকদের লাইসেন্স বাতিল সহ আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি।


