APORAD

চকবাজার ও বাড্ডায় নকল কফি ও নকল দুধের কারখানা: রাজধানীর হোটেলে যাচ্ছে বিষ | দৈনিক পূর্বাচল


নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল
ঢাকা: রাজধানীর বুকে চা-কফির নামে সাধারণ মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে বিষ। এক শ্রেণীর অসাধু চক্রের হাত ধরে চকবাজার এবং উত্তর বাড্ডা এলাকা থেকে প্রতিদিন শত শত কেজি নকল কফি ও ড্রামভর্তি নকল ও ভেজাল সিন্থেটিক দুধ সরবরাহ করা হচ্ছে বিভিন্ন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও টং দোকানে। চোখ ধাঁধানো নামী ব্যান্ডের মোড়কে এসব বিষাক্ত কফি এবং ক্ষতিকারক কেমিক্যাল মিশ্রিত নকল দুধ দেদারসে বিক্রি হলেও দেখার যেন কেউ নেই। জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ এই চক্রের জাল এখন পুরো রাজধানীতে বিস্তৃত।
চকবাজারের আড়ালে নকল কফির বিষাক্ত উপাদান
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুরান ঢাকার চকবাজারের কিছু গোপন কারখানায় নামী-দামী আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের (যেমন নেসক্যাফে, ক্যাডবেরি) হুবহু নকল প্যাকেট তৈরি করা হচ্ছে। কফির মূল উপাদানের পরিবর্তে সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে তেঁতুলের বিচির গুঁড়ো, পোড়া গম, নিম্নমানের রঙের ডাস্ট, কৃত্রিম সুগন্ধি (Flavour) এবং এক ধরণের বিশেষ কেমিক্যাল, যা কফিতে ফেনা তৈরি করতে সাহায্য করে। এই নকল কফিগুলো আসল ব্র্যান্ডের চেয়ে প্রায় অর্ধেক মূল্যে বাড্ডা ও চকবাজারের পাইকারি বাজারের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীর অভিজাত রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লার কফি শপগুলোতে।
বাড্ডা থেকে ছড়াচ্ছে শ্যাম্পু ও কেমিক্যালের ‘নকল দুধ’
অন্যদিকে, উত্তর বাড্ডা ও সাতারকূল সংলগ্ন কিছু এলাকা এখন কৃত্রিম বা নকল দুধ তৈরির অন্যতম ট্রানজিট পয়েন্টে পরিণত হয়েছে। গরুর দুধের কোনো অস্তিত্ব না রেখেই সম্পূর্ণ কৃত্রিম উপায়ে তৈরি হচ্ছে এই নকল দুধ। তরল ফর্মুলা তৈরি করতে মেশানো হচ্ছে লিকুইড শ্যাম্পু, ডিটারজেন্ট পাউডার, সয়াবিন তেল, থিকনার, ব্লিচিং পাউডার এবং ইউরিয়া সার। এই মরণঘাতী নকল দুধের বড় একটি অংশ প্রতিদিন ভোরে ও সন্ধ্যায় মিনি ট্রাক এবং ড্রামভর্তি ভ্যানে করে গুলশান, বনানী, বাড্ডা এবং রামপুরার বিভিন্ন নামী-দামী হোটেল ও মিষ্টির দোকানে সাপ্লাই দেওয়া হচ্ছে। আসল দুধের চেয়ে দাম অনেক কম হওয়ায় হোটেলের মালিকেরাও অধিক মুনাফার আশায় দেদারসে লুফে নিচ্ছেন এই তরল বিষ।
যেভাবে চলছে সাপ্লাই চেইন
এই ভেজাল ব্যবসার সাথে জড়িত এক সরবরাহকারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে দৈনিক পূর্বাচলকে জানান, “হোটেলগুলোতে সরাসরি আসল প্যাকেট বা ড্রাম দেখানো হলেও ভেতরে থাকে এই কমদামী ভেজাল মাল। অনেক রেস্তোরাঁর ম্যানেজার বা চা-কফি বানানোর কারিগরেরা (barista/কারিগর) এই সিন্ডিকেটের কাছ থেকে নিয়মিত কমিশন পান। ফলে আসল পণ্যের চেয়ে এই নকল পণ্যের চাহিদাই বেশি।”
চিকিৎসকদের উদ্বেগ: বাড়ছে ক্যানসার ও লিভারের ঝুঁকি
এই বিষয়ে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক প্রবীণ চিকিৎসক দৈনিক পূর্বাচলকে বলেন, “ডিটারজেন্ট, ইউরিয়া, শ্যাম্পু এবং কৃত্রিম রঙ মিশ্রিত এই নকল কফি ও নকল দুধ নিয়মিত খাওয়ার ফলে মানুষের লিভার নষ্ট (Liver Cirrhosis), কিডনি বিকল এবং পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি শতভাগ বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশুরা এই ভেজাল দুধের কারণে মারাত্মক অপুষ্টি ও পেটের মরণব্যাধিতে ভুগছে।”
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অভিযান দাবি
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, ভেজালের বিরুদ্ধে তাদের নিয়মিত অভিযান চলছে। তবে চকবাজার ও বাড্ডার এই সুনির্দিষ্ট চক্রের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে দ্রুতই র‍্যাব ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের সমন্বয়ে বড় ধরণের টাস্কফোর্স অভিযান চালানো হবে বলে দৈনিক পূর্বাচলকে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু জরিমানা নয়, মানুষের জীবন নিয়ে খেলা করা এই চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment