অন্যান্য

মসজিদ থেকে পানি নেওয়া নিষেধ: এসি বাড়লেও বন্ধ দুয়ার | দৈনিক পূর্বাচল

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল:

মসজিদের সুসজ্জিত টাইলস ও এসি বাড়লেও কমছে মানবিকতা। পানি পানে নিষেধের বিপরীতে দানবাক্স খোলা নিয়ে প্রশ্ন ও ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে প্রতিবেদন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবি সম্প্রতি বিবেকবান মানুষকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছে। মসজিদের প্রবেশদ্বারে বড় অক্ষরে লেখা—”মসজিদ থেকে পানি নেওয়া নিষেধ”। অথচ ঠিক পাশেই ঝুলছে দানবাক্স, যেখানে অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে নেই কোনো বাধ্যবাধকতা বা নিষেধ!

ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাস ও সুফি-সাধকদের খানকাহ সংলগ্ন মসজিদগুলোর চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। রসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে ‘মসজিদে নববী’ কেবল সালাত আদায়ের স্থান ছিল না; তা ছিল গৃহহীন আসহাবে সুফফাদের স্থায়ী ঠিকানা, মুসাফিরের আশ্রয়স্থল এবং বিচার ও মানবিক সহযোগিতার প্রাণকেন্দ্র। ইতিহাস সাক্ষী, সুফি সাধকদের মসজিদ সংলগ্ন লঙ্গরখানায় ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকল তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত মানুষের অন্ন ও পানের সংস্থান হতো।

জাকজমক বাড়লেও কমেছে উদারতা

বর্তমানের আধুনিক যুগে মসজিদে ঝাড়বাতি, এসি, ও দামী টাইলসের প্রাচুর্য বাড়লেও বিস্ময়করভাবে কমেছে মসজিদের উন্মুক্ত দরজা। প্রচণ্ড খরতাপে কোনো পরিশ্রান্ত শ্রমজীবী, রিকশাচালক কিংবা পথচারী সাধারণ ওজুখানায় একটু মুখ ধুতে বা ফ্যানের নিচে কয়েক মিনিট বিশ্রাম নিতে পারেন না। ওয়াক্তিয়া সালাত শেষ হওয়ার ১০-১৫ মিনিটের মধ্যেই ঝুলিয়ে দেওয়া হয় শিকল ও তালা।

ইসলামী শরিয়ত ও সুন্নাহর দৃষ্টিভঙ্গি

ইসলামে মসজিদকে ‘আল্লাহর ঘর’ এবং মানবসেবার কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কোনো বান্দাকে আল্লাহর ঘর বা এর পানি ও আশ্রয় থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।

  • কুরআনের নির্দেশ: পবিত্র কুরআনে এরশাদ হয়েছে, “তার চেয়ে বড় জালেম আর কে হতে পারে, যে আল্লাহর মসজিদে তাঁর নাম জিকির (ইবাদত) করতে বাধা দেয় এবং তার ধ্বংসসাধনে চেষ্টা করে?” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত: ১১৪)।

  • পানি ও সেবার গুরুত্ব: মহানবী (সা.) বলেছেন, “সবচেয়ে উত্তম সদকা হলো মানুষকে পানি পান করানো।” (আবু দাউদ)। অন্য একটি হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি কোনো তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি পান করায়, আল্লাহ তাকে কিয়ামতের দিন মোহরঙ্কিত জান্নাতী পানীয় থেকে পান করাবেন।” (তিরমিজি)।

তৃষ্ণার্ত পথচারীকে পানি পানে বাধা দেওয়া ইসলামের এই মানবিক ও উদার শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।

উম্মাহর ঐক্যে ফাঁটল ও জনবিচ্ছিন্নতা

সাধারণ মুসল্লি ও গণমানুষের পকেটের টাকায় নির্মিত এসব উপাসনালয় যদি কেবল নির্ধারিত কমিটি বা ব্যবস্থাপকদের নির্দেশে আমজনতার জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে, তবে তা উম্মাহর মধ্যে এক বড় ধরনের দূরত্ব তৈরি করবে। দানগ্রহণে উদার অথচ মানবিক সেবায় কঠোর—এমন নীতি মসজিদের মৌলিক চেতনার সাথে সংঘাতপূর্ণ।

মসজিদকে কেন্দ্র করে পুনরায় সমাজসেবা, মানবিক আশ্রয় ও ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার সময় এখনই। চাবি বন্ধ তালা নয়, বরং সচেতনতা ও সঠিক তদারকির মাধ্যমে আল্লাহর ঘরকে সর্বস্তরের মানুষের শান্তির নীড় হিসেবে উন্মুক্ত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment