দৈনিক পূর্বাচল
নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁদপুর:
চাঁদপুরের মতলব উত্তরের তরুণ উদ্যোক্তা মো. মহীন হোসাইন মুরগির বিষ্ঠা থেকে বায়োগ্যাস তৈরি করে চমক সৃষ্টি করেছেন। মাত্র ১,২০০ টাকায় ১২টি পরিবার পাচ্ছে রান্নার গ্যাস।
মুরগির খামারের বর্জ্য থেকে প্রতিনিয়ত ছড়ানো দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণ রোধে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন চাঁদপুরের মতলব উত্তরের তরুণ উদ্যোক্তা মো. মহীন হোসাইন। খামারের বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তর করে মুরগির বিষ্ঠা থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করছেন তিনি। বর্তমানে উৎপাদিত এই গ্যাস পাইপলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে এলাকার ১২টি পরিবারের কাছে। ফলে মাত্র ১ হাজার ২০০ টাকার বিনিময়ে নিরবচ্ছিন্ন রান্নার গ্যাসের সুবিধা পাচ্ছেন ওই পরিবারগুলো।
খামার থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন যেভাবে
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার পূর্ব ফতেপুর ইউনিয়নের লুদুয়া গ্রামের বাসিন্দা মহীন হোসাইন ছোটবেলা থেকেই পশুপাখি পালনের প্রতি অনুরাগী ছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৩ সালে লেয়ার মুরগির খামার গড়ে তুলে উদ্যোক্তা হিসেবে নিজের যাত্রা শুরু করেন তিনি। বর্তমানে তাঁর দুটি খামারে প্রায় ৩ হাজার মুরগি রয়েছে, যার মধ্যে দুই হাজারের অধিক মুরগি থেকে নিয়মিত ডিম উৎপাদিত হচ্ছে।
খামারে মুরগির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই বিষ্ঠার পরিমাণও বৃদ্ধি পেতে থাকে। খোলা মাঠে বা জায়গায় এসব বর্জ্য ফেলে রাখলে মারাত্মক দুর্গন্ধ ও পরিবেশদূষণের ঝুঁকি তৈরি হয়। এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান খুঁজতে গিয়ে অভিনব এক পথ বেছে নেন মহীন। প্রায় আড়াই লাখ টাকা ব্যয় করে নিজ উদ্যোগেই খামারে স্থাপন করেন একটি বায়োগ্যাস প্লান্ট।
খামারের পাশেই নির্মাণ করা হয়েছে দুটি ট্যাংক। একটি ট্যাংকে পাম্পের মাধ্যমে খামারের সমস্ত মুরগির বিষ্ঠা নিয়মিত জমা করা হয়। সেখান থেকেই বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত হচ্ছে বায়োগ্যাস, যা পাইপলাইনের সাহায্যে সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে আশপাশের গ্রাহকদের রান্নার চুলায়। এছাড়া বায়োগ্যাস উৎপাদনের পর যে অবশিষ্ট বর্জ্য বা স্লারি থাকে, তা উচ্চমানের জৈবসার হিসেবে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সুফল পাচ্ছেন স্থানীয় গৃহিণীরা
বায়োগ্যাস ব্যবহারকারী সুফিয়া বেগম জানান, আগে তাঁরা নিয়মিত লাকড়ি দিয়ে রান্না করতেন, যার ফলে নানা ধরনের ভোগান্তি পোহাতে হতো। কিন্তু এখন আর এলপিজি সিলিন্ডারের পেছনে অতিরিক্ত টাকা খরচ করতে হয় না; অনেক কম খরচে সহজে গ্যাস পাচ্ছেন তাঁরা।
অন্য আরেক গ্রাহক রেহানা বেগম সন্তুষ্টি প্রকাশ করে জানান, তাঁরা কখনো কল্পনাও করেননি যে খামারের বর্জ্য থেকে এভাবে গ্যাস বা এমন চমৎকার সুযোগ-সুবিধা পাবেন। বর্তমানে নিয়মিত গ্যাস সরবরাহ পাওয়ায় তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত।
পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
উদ্যোক্তা মো. মহীন হোসাইন জানান, বর্তমানে যে ১২টি পরিবারকে তিনি গ্যাস সংযোগ দিয়েছেন, তাঁরা সবাই খুব খুশি এবং ২৪ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস পাচ্ছেন। এলাকায় বায়োগ্যাসের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ভবিষ্যতে এই সেবা অন্তত ৫০টি পরিবারে সম্প্রসারণের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা তাঁর রয়েছে। এছাড়া বায়োগ্যাস প্লান্ট থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তা স্থানীয়দের মাঝে বিতরণের বড় একটি লক্ষ্যও তাঁর রয়েছে।
মহীনের হিসাব অনুযায়ী, তাঁর খামারের ৩ হাজার মুরগির বর্জ্য থেকে অন্তত ৫০টি চুলায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ করা পুরোপুরি সম্ভব। এতে একদিকে যেমন খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জটিলতা দূর হবে, অন্যদিকে পরিবেশদূষণ কমার পাশাপাশি উদ্যোক্তার বাড়তি আয়ের পথও সুগম হবে। বর্তমান গ্রাহকরা প্রতিমাসে ১ হাজার ২০০ টাকা করে দিয়ে এই সেবা গ্রহণ করছেন। উদ্যোক্তার লক্ষ্য অর্জিত হলে খামারের বর্জ্য থেকেই বড় পরিসরে বিকল্প জ্বালানির উৎস গড়ে উঠবে।
প্রাণিসম্পদ বিভাগের মতামত
এই উদ্যোগের বিষয়ে চাঁদপুর জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা জ্যোতির্ময় ভৌমিক জানান, বায়োগ্যাস প্লান্ট যেকোনো খামারকে পরিবেশবান্ধব করে তুলতে এবং দেশের বর্তমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বায়োগ্যাসের বহুমুখী ব্যবহারের মাধ্যমে খামার যেমন দূষণমুক্ত হয়, তেমনি সাশ্রয়ী জ্বালানির পাশাপাশি উৎপাদিত জৈবসার কৃষিকাজে দারুণভাবে কাজে লাগানো যায়। ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনো খামারি এ ধরনের আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি গ্রহণ করতে চান, তবে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁদের সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, মুরগির বিষ্ঠা থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদনের এই উদ্যোগ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক সমাধান তো বটেই, একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি ও জৈবসার উৎপাদনের এক অনন্য মডেল। স্থানীয় পর্যায়ে অন্যান্য খামারিরা যদি এই ধরনের উদ্যোগে এগিয়ে আসেন, তবে একদিকে যেমন এলপিজি সিলিন্ডারের ওপর সাধারণ মানুষের চাপ কমবে, অন্যদিকে টেকসই উপায়ে পরিবেশ সুরক্ষাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।


