নিজস্ব প্রতিবেদক:
ভোরের আলো পুরোপুরি ফোটার আগেই পুরান ঢাকার সরু গলির দেয়ালে যখন রাতের শেষ অন্ধকারটুকু লেগে থাকে, ঠিক তখনই চুল্লি থেকে উঠতে শুরু করে ময়দা, ঘি আর পোড়া কাঠের মিশ্রিত সুবাস। তপ্ত চুল্লির লেলিহান শিখায় সেঁকে তোলা গরম চায়ে ডুবানো মচমচে বাকরখানি পুরান ঢাকাবাসীর কাছে কেবল একটি নাশতা নয়, বরং শতাব্দীর ঐতিহ্য ও স্মৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মুঘল আমল থেকে পুরান ঢাকার রন্ধন ঐতিহ্য
বাকরখানির গল্প কেবল পুরান ঢাকার অলিগলিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর শিকড় ছড়িয়ে আছে মুঘল আমলের ইতিহাসে। প্রচলিত ইতিহাস ও লোককথা অনুযায়ী, বাকরখানি নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে মুঘল আমলের ঢাকার নায়েব নাজিম আগা বাকের এবং আরাকানের এক মগ রাজার কন্যা খনি বিবির অমর প্রেম, ক্ষমতা ও ট্র্যাজেডির গল্প। তাদের নামের অংশ— আগা বাকেরের ‘বাকর’ এবং খনি বিবির ‘খানি’ মিলে তৈরি হয়েছে আজকের সুপরিচিত ‘বাকরখানি’ নামটি। মধ্য এশিয়া বা পারস্য অঞ্চল থেকে মুঘল বণিক ও অভিজাতদের হাত ধরে এই খাদ্যাভ্যাস ঢাকায় প্রবেশ করলেও পরবর্তীতে এটি পুরান ঢাকার নিজস্ব রন্ধন ঐতিহ্যের একটি অংশ হয়ে ওঠে।
বদলাতে থাকা সময় ও বাকরখানির বর্তমান রূপ
পুরান ঢাকার পুরনো ইটের বাড়ির জায়গায় আধুনিক বহুতল ভবন উঠলেও বাকরখানির স্বাদে কোনো পরিবর্তন আসেনি। একসময় কেবল সকালের নাশতায় চায়ের সঙ্গে এর প্রচলন থাকলেও, বর্তমানে স্কুলপড়ুয়াদের টিফিন বক্স, বিয়ে কিংবা বিশেষ দিনের খাবারের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বাকরখানি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ধরনেও এসেছে বৈচিত্র্য— এখন বাজারে মিষ্টি ও নারকেলি স্বাদের বাকরখানিও পাওয়া যায়। তবে সব বৈচিত্র্য ছাপিয়ে ক্রেতাদের প্রথম পছন্দ সেই ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার বাকরখানি। দয়াগঞ্জ মোড় কিংবা রামপুরার বিভিন্ন এলাকার বিক্রেতারা জানান, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আজও পরিবারের জন্য কেজি হিসেবে বাকরখানি কিনে নিয়ে যান।
পেশার চ্যালেঞ্জ ও টিকে থাকার লড়াই
বাকরখানি কেবল একটি খাবার নয়, এটি বহু কারিগরের শ্রম, জীবিকা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রামের গল্প। তবে আধুনিক বেকারি ও ফাস্টফুডের ভিড়ে নতুন প্রজন্মের অনেকেই আজ বাকরখানি ভুলতে বসেছে। পাশাপাশি চুল্লির তীব্র তাপ ও দীর্ঘ সময়ের কঠোর পরিশ্রমের কারণে নতুন প্রজন্মের তরুণরা এই পেশায় আসতে অনীহা প্রকাশ করছেন। ফলে দক্ষ কারিগরের সংকটে প্রাচীন এই কারিগরি জ্ঞান টিকিয়ে রাখাই এখন বড় এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শহর বদলাবে, মানুষের খাদ্যাভ্যাসও বদলাবে; তবুও পুরান ঢাকার কোনো এক সরু গলিতে ভোরের চুল্লি জ্বলে ওঠার মধ্য দিয়েই বেঁচে থাকবে শতবর্ষী এই ঐতিহ্য— যেখানে বাকরখানি নিছক কোনো খাবার নয়, বরং একটি জীবন্ত সংস্কৃতি।


