অর্থনীতি

মাছের সঙ্গে ঝিনুকে মুক্তা চাষে সাফল্য: গোপালগঞ্জে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার

‘দৈনিক পূর্বাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক | গোপালগঞ্জ

প্রকাশিত: ৩ অক্টোবর ২০২৬

“ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও!”—কবি আবুল হাসানের এই পঙক্তির মতোই ‘বিষের বালি’ বা কৃত্রিম নিউক্লিয়াসের যন্ত্রণা সহ্য করে মুক্তা উৎপাদন করছে ঝিনুক। আর প্রকৃতির এই অনন্য বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় মাছের পাশাপাশি একই পুকুরে সফলভাবে উৎপাদিত হচ্ছে মূল্যবান মুক্তা। এর মাধ্যমে স্থানীয় মৎস্যচাষিদের জন্য আয়ের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

মৎস্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় কোটালীপাড়ার ছয়টি পুকুরে পরীক্ষামূলকভাবে মুক্তা চাষের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এসব পুকুরে ৭ হাজার ৮০০টি ঝিনুকে ইমেজ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে চাষ শুরু করা হয়। পরবর্তীতে পরীক্ষা চালিয়ে সেখান থেকে প্রায় ১৭ হাজার ৪০০টি আকর্ষণীয় ইমেজ মুক্তা সফলভাবে সংগ্রহ করা হয়।

কম খরচে অধিক লাভজনক চাষ পদ্ধতি

মৎস্য কর্মকর্তাদের মতে, উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এক একর আয়তনের একটি পুকুরে প্রায় ২০ হাজার ঝিনুক রাখা সম্ভব। ঝিনুকের জন্য আলাদা কোনো কৃত্রিম খাবারের প্রয়োজন হয় না; পানিতে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনই এর মূল খাদ্য। ফলে পুকুরে পর্যাপ্ত ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটন থাকলে মাছের কোনো ক্ষতি না করেই একই জলাশয়ে সফলভাবে ঝিনুক চাষ করা যায়।

কোটালীপাড়া উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা এস এম শাহজাহান সিরাজ জানান, “মাছের সঙ্গে একই পুকুরে ঝিনুক রেখে মুক্তা উৎপাদন সম্ভব। এতে একই জলাশয় থেকে মাছের পাশাপাশি অতিরিক্ত মুক্তা পাওয়া যায়।” এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে জেলার পাঁচ উপজেলা থেকে ২৫ জন উদ্যোক্তাকে নির্বাচন করে বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছিল মৎস্য বিভাগ।

চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনার পথ

উদ্যোক্তাদের মাঝে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি হলেও প্রকল্পের মেয়াদ গত জুনে শেষ হওয়ার পর সরকারি সহায়তা বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে কোটালীপাড়ার মাত্র দুটি পুকুরে মুক্তা চাষ চালু রয়েছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম জানান, গোপালগঞ্জের পাঁচ উপজেলায় ১৯ হাজার ৪৬২টি পুকুর রয়েছে, যেগুলোতে মুক্তা চাষের দারুণ সুযোগ রয়েছে। তবে চাষিদের উৎসাহিত করা হলেও উৎপাদিত মুক্তা বিক্রির নিশ্চিত বাজার না থাকায় অনেকেই বড় ধরনের বিনিয়োগে এগিয়ে আসতে ভয় পাচ্ছেন। বর্তমানে হাতেগোনা কয়েকটি মাত্র ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান মুক্তা কিনছে, যা নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

রপ্তানি আয়ের নতুন খাত হওয়ার সম্ভাবনা

বিশেষজ্ঞদের মতে, গোলাকার মুক্তা উৎপাদনে তুলনামূলক বেশি সময় লাগলেও ‘ইমেজ মুক্তা’ কম সময়ে উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে মাছ চাষের পাশাপাশি ইমেজ মুক্তা চাষ হতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি লাভজনক সহায়ক খাত।

সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, উৎপাদনের পাশাপাশি যদি মুক্তার স্থায়ী বাজার, সুনির্দিষ্ট বিপণন ব্যবস্থা ও ক্রেতা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা যায়, তবে গোপালগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই খাতের পরিধি বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব। মানসম্মত মুক্তা উৎপাদনের মাধ্যমে ভবিষ্যতে এটি দেশের অর্থনীতিতে রপ্তানি আয়ের একটি নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করতে পারে।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment