প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছেন:সোহেল হাওলাদার
নির্বাহী সম্পাদক/দৈনিক পূর্বাচল
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে ঘাতক বাবা ও স্বজনদের হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া পাঁচ বছরের শিশু তুহিন হত্যা মামলার দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া শেষে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর ঘটে যাওয়া এই নৃশংস ও হৃদয়বিদারক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তুহিনের বাবা আবদুল বাছির ও চাচা নাসির উদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত।
প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গিয়ে নিজেদেরই যে সাজানো ফাঁদে পড়তে হয়েছিল, তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় সেই লোমহর্ষক তথ্যই বেরিয়ে এসেছে।
যেভাবে ঘটেছিল মর্মান্তিক সেই ঘটনা
২০১৯ সালের ১৩ অক্টোবর গভীর রাত। দিরাই উপজেলার কেজাউরা গ্রামে নিজের ঘরের বিছানায় বাবা আবদুল বাছিরের পাশেই ঘুমিয়ে ছিল পাঁচ বছরের শিশু তুহিন মিয়া। রাতের কোনো একসময় ঘরের দরজা খুলে যায় এবং ঘুমন্ত তুহিনকে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরদিন ভোরে বাড়ির কাছের একটি গাছ থেকে তুহিনের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার পেটে বিদ্ধ ছিল দুটি ছুরি, শরীরে ছিল নির্মম নির্যাতনের চিহ্ন এবং কেটে নেওয়া হয়েছিল দুই কান ও যৌনাঙ্গ। ঘটনাস্থলে পেটে বিদ্ধ ছুরির হাতলে প্রতিপক্ষের নাম লিখে রেখে পুরো ঘটনাটিকে একটি রাজনৈতিক বা পূর্বশত্রুতার প্রতিশোধমূলক হত্যাকাণ্ড হিসেবে সাজানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
তদন্তে বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক সত্য
ঘটনার পরদিন তুহিনের মা মনিরা বেগম অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে দিরাই থানায় হত্যা মামলা করেন। কিন্তু পুলিশি তদন্তে পাল্টে যেতে থাকে ঘটনার গতিপথ। তদন্তে বেরিয়ে আসে, কোনো প্রতিপক্ষ নয়, বরং ঘরের ভেতর থেকেই শিশুটিকে তুলে দেওয়া হয়েছিল ঘাতকদের হাতে।
পুলিশের তদন্ত ও আসামিদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানা যায়, ঘটনার রাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন তুহিনকে তার বাবা আবদুল বাছির নিজেই ঘাতকদের হাতে তুলে দেন। ঘরের বাইরে ওত পেতে থাকা চাচা ও অন্য স্বজনরা মিলে শিশুটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করে গাছে ঝুলিয়ে দেয়। প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর জন্যই এই পৈশাচিক পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
আদালতের রায় ও বিচারিক পরিণতি
তদন্ত শেষে পুলিশ পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২০২০ সালের ৭ জানুয়ারি প্রাপ্তবয়স্ক চার আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয় এবং শিশু আসামির বিচার চলে শিশু আদালতে।
২০২০ সালের ১০ মার্চ শিশু আদালত ১৭ বছর বয়সী কিশোর শাহরিয়ার আহমদকে আট বছরের আটকাদেশ দেন। এরপর ১৬ মার্চ সুনামগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ ওয়াহিদুজ্জামান শিকদার মূল মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে তুহিনের বাবা আবদুল বাছির ও চাচা নাসির উদ্দিনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং অপর দুই আসামিকে খালাস দেওয়া হয়।
যে ঘরটি একটি শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় হওয়ার কথা ছিল, এই মামলার রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো—লোভ ও প্রতিহিংসার বলি হয়ে সেই ঘর থেকেই নেমে এসেছিল নির্মম মৃত্যুর পরোয়ানা।


