নিজস্ব প্রতিবেদক:দৈনিক পূর্বাচল
ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের মানুষ চা পানে অভ্যস্ত হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশের শহুরে তরুণ প্রজন্ম, শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী শ্রেণির হাত ধরে নীরবে এক কফিবিপ্লব ঘটে গেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে বর্তমানে কফির বাজার ৫০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে এবং এই বাজারটি প্রতি বছর প্রায় ১৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে চাহিদার এই ব্যাপক উল্লম্ফন সত্ত্বেও মোট চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশই মেটাতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে।
আমদানির চিত্র ও প্রবৃদ্ধি: জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে কফি ও কফি বিনের আমদানি বিগত পাঁচ বছরে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দেশে বার্ষিক প্রায় ১ হাজার ১২০ টন কফি আমদানি হয়েছিল, যা চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ২০২১-২২ অর্থবছরে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৪৮০ টনে। পরবর্তী ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ রেকর্ড ১ হাজার ৭৩২ টনে পৌঁছায়। তবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধি এবং ডলার সংকটের প্রভাবে আমদানি সামান্য কমে ১ হাজার ৪৩৯ টনে দাঁড়ালেও স্থানীয় বাজারে ভোক্তা চাহিদা কমেনি। বর্তমানে গড়ে প্রতি বছর প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টন কফি আমদানি হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্য আন্তর্জাতিক বাজারে কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে।
আমদানি করা কফির প্রায় ৮৩ থেকে ৯০ শতাংশই ইনস্ট্যান্ট কফি এবং বাকি অংশ প্রিমিয়াম কফি বিন হিসেবে দেশে আসছে। বিশ্বের প্রায় ৪৩টি দেশ থেকে কফি আসলেও একক দেশ হিসেবে মোট আমদানির প্রায় ৬৭ শতাংশই সরবরাহ করছে প্রতিবেশী ভারত। এ ছাড়া ব্রাজিল, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও কলম্বিয়া থেকেও বিপুল পরিমাণ কফি বিন ও প্রক্রিয়াজাত কফি বাজারে প্রবেশ করছে।
বিকাশমান বাজার ও পরিবর্তনের ধারা: ভোক্তার চাহিদা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে যেখানে চা বিক্রির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি গড়ে ৪ থেকে ৫ শতাংশ, সেখানে কফি পানের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে প্রতি বছর গড়ে ১৩ থেকে ১৫ শতাংশ হারে। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৫ শতাংশ পরিবার নিয়মিত কফি পানে অভ্যস্ত। শহুরে তরুণ সমাজের (১৮-৩৫ বছর) কাছে এটি ফ্যাশন এবং সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। বিগত কয়েক বছরে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ প্রধান শহরগুলোয় শত শত প্রিমিয়াম কফিশপ গড়ে ওঠার পাশাপাশি ছোট টি-স্টল থেকে শুরু করে বাসাবাড়ি ও করপোরেট অফিসে থ্রি-ইন-ওয়ান স্যাশে কফির ব্যাপক ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্থানীয় উৎপাদন ও অপার সম্ভাবনা: বাংলাদেশে হালকা সুবাস ও কম ক্যাফেইনযুক্ত অ্যারাবিকা কফি বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির পাহাড়ি এলাকায় এবং কড়া স্বাদ ও তিতা ভাবযুক্ত রোবাস্টা কফি টাঙ্গাইল, শেরপুর ও নীলফামারীর সমতল অঞ্চলে চাষ করা হচ্ছে। বর্তমানে দেশে বছরে মাত্র ২৫ থেকে ৬০ টনের মতো কফি উৎপাদিত হলেও, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিশেষ প্রকল্পের আওতায় ১৯টি জেলার ৪৫টি উপজেলায় কফি চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় উৎপাদন কয়েক হাজার টনে উন্নীত করার লক্ষ্য হাতে নেওয়া হয়েছে।
বাজারের শীর্ষ ব্র্যান্ড ও চ্যালেঞ্জ: বাজারের শীর্ষ ব্র্যান্ডগুলোর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের বহুজাতিক ব্র্যান্ড নেসলে বা নেসক্যাফে দীর্ঘদিন ধরে একক আধিপত্য ধরে রেখে মোট আমদানির ২৭ থেকে ৪৭ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে দেশীয় শিল্পগোষ্ঠী হিসেবে আবুল খায়ের গ্রুপের ‘আমা কফি’ প্রায় ২৭ শতাংশ অংশীদারত্ব নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। এছাড়া মেঘনা গ্রুপ, প্রাণ গ্রুপ, নর্থ অ্যান্ড কফি রোস্টার্স, গ্লোরিয়া জিন্স, ক্রিমসন কাপ এবং পাহাড়ি অঞ্চলের স্থানীয় ব্র্যান্ড ‘ফুরোমোন কফি’ বাজারে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে।
খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে রয়েছে— স্থানীয় পর্যায়ে প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব, কৃষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং স্থানীয় চাষি ও বড় প্রসেসরদের মধ্যে সরাসরি সাপ্লাই চেইনের অনুপস্থিতি। তবে সঠিক সরকারি উদ্যোগ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা এবং চাষিদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে কফি উৎপাদনে স্বাবলম্বী হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ।


