সোহেল হাওলাদার, দৈনিক পূর্বাচল:
পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও পুলিশি প্রতিবেদনের রাজনৈতিক ‘তকমা’ ও বিরূপ মন্তব্যের কারণে বিসিএসে চাকরি বঞ্চিত হচ্ছেন শত শত মেধাবী তরুণ। দেখুন বিস্তারিত।
মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশন (পিএসসি) চূড়ান্ত সুপারিশ করার পরও কেবল পুলিশি প্রতিবেদনের ‘বিরূপ’ মন্তব্যের কারণে সরকারি চাকরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন শত শত তরুণ-তরুণী। পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় বা গোপনীয় প্রতিবেদনের বেড়াজালে পড়ে বিগত কয়েকটি বিসিএসে হাজারো প্রার্থীর জীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। এমনকি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও এই বৈষম্যমূলক ধারা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ ভেরিফিকেশনের নামে রাজনৈতিক ‘তকমা’
অনুসন্ধানে জানা যায়, বাকের আল মাহমুদ (ছদ্মনাম) নামের এক প্রার্থী বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে পিএসসির সুপারিশ পাওয়ার পরও শুধুমাত্র পারিবারিক রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে প্রথম দফায় নিয়োগবঞ্চিত হন। যদিও পরবর্তীতে স্থানীয় সংসদ সদস্যের ডিও লেটার ও পুনরায় তদন্তে তার পরিবারের কেউ রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত নন মর্মে প্রতিবেদন দেওয়া হয়, ততক্ষণে তার নিয়োগের পথ বন্ধ হয়ে যায়।
শুধু মাহমুদ একা নন; বিগত ৩৮তম থেকে ৪৪তম বিসিএস পর্যন্ত পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশ পাওয়ার পরও পুলিশি প্রতিবেদনে নেতিবাচক মন্তব্যের অজুহাতে অন্তত আড়াইশ থেকে তিনশ প্রার্থী চাকরি পাননি। ক্যাডার পদের পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকসহ নন-ক্যাডার পদে নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের হয়রানির শিকার হচ্ছেন প্রার্থীরা। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকার কথা থাকলেও যাচাইয়ের নামে মূলত মা-বাবা, ভাই কিংবা আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খোঁজা হয়। অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবেদন প্রস্তুতকারী পুলিশ সদস্যকে ‘ম্যানেজ’ না করলে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে নেতিবাচক মন্তব্য জুড়ে দেওয়া হয়।
বিদ্যমান বিধিমালা যা বলে
বিসিএস নিয়োগ বিধিমালা ১৯৮১ অনুযায়ী, কোনো প্রার্থীকে মেডিকেলে অযোগ্য বা ফৌজদারি অপরাধী হিসেবে প্রমাণিত না হলে তাকে নিয়োগবঞ্চিত করার কোনো বিধান নেই। এমনকি প্রার্থীর পরিবার বা নিকটাত্মীয়রা ভিন্ন রাজনৈতিক আদর্শের অনুসারী হলেও তা প্রার্থীকে বাদ দেওয়ার কারণ হতে পারে না। সরকারি চাকরির পূর্বশর্ত হিসেবে প্রার্থীর রাষ্ট্রবিরোধী কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা যাচাই করাই পুলিশি প্রতিবেদনের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবে এই বিধি লঙ্ঘন করে ঢালাওভাবে রাজনৈতিক পরিচয় টেনে আনা হচ্ছে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংবিধানের মৌলিক অধিকারের অনুচ্ছেদের ২৯ ধারা অনুযায়ী, পিএসসির সুপারিশের পর তথাকথিত ভেরিফিকেশনের নামে মেধাবীদের বাদ দেওয়া কোনোভাবেই সংবিধানসম্মত নয়। সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার এ প্রসঙ্গে জানান, ব্রিটিশ ও পাকিস্তান আমল থেকেই এই আমলাতান্ত্রিক অনাচার চলে আসছে, যা কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও ঐক্যের মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও অব্যাহত বঞ্চনা
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলের ধারাবাহিকতা অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়েও পুরোপুরি কাটেনি। ৪৪তম বিসিএসের গেজেটে পিএসসির চূড়ান্ত সুপারিশপ্রাপ্ত ১৮৬ জন এবং ৪৩তম বিসিএসের অন্তত ৬৫ জন প্রার্থী গেজেটভুক্ত না হওয়ায় এখনো দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তবে জনপ্রশাসন সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পিএসসির সুপারিশ অনুযায়ী বিধি মোতাবেক নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে এবং নিয়মের বাইরে কিছু হওয়ার সুযোগ নেই।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সুপারিশ
এই দীর্ঘদিনের নৈরাজ্য দূর করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন পদোন্নতি ও নিয়োগের ক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে রাজনৈতিক পরিচয় জানার প্রথা বাতিলের জোরালো সুপারিশ করেছে। কমিশনের মতে, এই স্তর থেকেই মূলত জনপ্রশাসনের অনৈতিক রাজনৈতিকীকরণ শুরু হয়। এছাড়া লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগে অযৌক্তিক পুলিশি যাচাই বাতিল করে শুধুমাত্র চূড়ান্ত নিয়োগের পূর্বে ফৌজদারি মামলা ও দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—সে বিষয়ে প্রতিবেদন চাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মেধা ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে পুলিশি ভেরিফিকেশনের নামে চলা এই হয়রানিমূলক প্রথা অবিলম্বে বন্ধ করা না হলে তা দেশের মেধাবী তরুণ সমাজকে চরম হতাশার দিকে ঠেলে দেবে।


