আন্তর্জাতিক

মধ্যপ্রাচ্য সংকটে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা: অপরিশোধিত তেলের দাম ১০৮ ডলার ছাড়াল

নিজস্ব প্রতিবেদক:

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে সরবরাহ সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশ্ববাজারে এরই মধ্যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৮ ডলার ছাড়িয়েছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন দেশের নেওয়া পূর্ববর্তী পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতাও ধীরে ধীরে সীমিত হয়ে আসায় বিশ্বজুড়ে নতুন অর্থনৈতিক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

তেলের দামে উল্লম্ফন ও হরমুজ প্রণালিতে চাপ

তথ্য অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৬৫ ডলার। তবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তা বেড়ে ১০৮ ডলারের বেশি হয়েছে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের তেল পরিবহনের অন্যতম প্রধান রুট গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল ১৫ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর বিশ্লেষকেরা তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত ওঠার আশঙ্কা করেছিলেন। যদিও এখনো সেই পরিস্থিতি তৈরি হয়নি, তবে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর প্রতিনিয়ত চাপ বাড়ছে।

বিকল্প পাইপলাইনে হামলা ও রাশিয়ার সরবরাহ সংকট

হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ কমে যাওয়ায় সৌদি আরব বিকল্প হিসেবে পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল পরিবহন বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল। আবকাইক থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু পর্যন্ত বিস্তৃত এই পাইপলাইনের দৈনিক পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ৭০ লাখ ব্যারেল। তবে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হুতিদের হামলার মুখে পাইপলাইনটির তেল সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়। সীমিত পরিসরে এটি চালুর চেষ্টা চললেও পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে আরও ৬ থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগಬಹುದು।

অন্যদিকে, ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ডিজেল উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে। ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করায় বিশ্ববাজারে দৈনিক ডিজেল সরবরাহ আরও প্রায় ৩ শতাংশ কমে গেছে। এর জেরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭টি রাজ্যে ডিজেলের দাম রেকর্ড গড়েছে এবং জাতীয়ভাবে প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৫২ ডলারে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ডিজেল রপ্তানি বন্ধের হুমকি দেওয়ায় বৈশ্বিক বাজারে সংকট আরও ঘনীভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়া ও ইউরোপে মারাত্মক প্রভাব

এই জ্বালানি সংকটে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। মার্কিন বাজারের তুলনায় এই অঞ্চলের দেশগুলো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন দেশে জ্বালানি রেশনিং করতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি সাশ্রয়ে কর্মসপ্তাহ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম সংক্ষিপ্ত করার মতো কড়া পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। ইউরোপের অবস্থাও ভিন্ন নয়; গত ২০ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সের প্রায় ১৫ শতাংশ সার্ভিস স্টেশনে ডিজেল বা গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

কৌশলগত মজুতে টান এবং চীনের ভূমিকা

জ্বালানির চাহিদা নিয়ন্ত্রণ ও সরবরাহ বাড়াতে গত মার্চে ৩২টি দেশের জোট কৌশলগত মজুত থেকে ৪০ কোটির বেশি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছিল। এর মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই প্রায় ১৩ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ায় দেশটির কৌশলগত মজুত গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। ফলে নতুন করে মজুত থেকে বড় পরিমাণে তেল ছাড়ার সুযোগ প্রায় ফুরিয়ে এসেছে।

এই জটিল পরিস্থিতিতে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে দেশটি অপরিশোধিত তেল আমদানি প্রায় ৫০ শতাংশ কমিয়েছিল। পাশাপাশি অর্থনীতিতে বিদ্যুতায়নের ব্যবহার বাড়ায় তেলের অভ্যন্তরীণ চাহিদাও কিছুটা কমেছিল। তবে আগস্টে চীনের অপরিশোধিত তেল আমদানি আগের মাসের তুলনায় ৬ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আমদানি এখনো যুদ্ধপূর্ব পর্যায়ে না পৌঁছালেও বর্ধিত চাহিদা এবং সামগ্রিক সরবরাহ সংকটের কারণে আগামী সপ্তাহগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment