অন্যান্য

সমাজে বাড়ছে চরম অসহিষ্ণুতা ও নৃশংসতা: উদ্বিগ্ন বিশারদরা | দৈনিক পূর্বাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক পূর্বাচল

বৈষম্য, বিচারহীনতা ও মূল্যবোধের অভাবে সমাজে বাড়ছে চরম অসহিষ্ণুতা ও নৃশংস অপরাধ। বিশারদদের মতামত ও সাম্প্রতিক চিত্র নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে দিন দিন মানুষের মধ্যে সহনশীলতা দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সম্পদের সুষম বণ্টনের অভাব, যুবসমাজ ও সাধারণ মানুষের মাঝে ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব এবং অপরাধ করেও শাস্তি না পাওয়ার প্রবণতা সমাজে অপরাধ ও ক্ষোভের মাত্রা বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর ফলে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারি, পারিবারিক কলহ এবং হত্যাকাণ্ডের মতো নৃশংস ঘটনা এখন প্রায় নিয়মিত দৃশ্যে পরিণত হয়েছে।

নৃশংস অপরাধ ও সাম্প্রতিক চিত্র

বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ তার স্বাভাবিক সহনশীলতা হারিয়ে চরম মানসিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক কিছু মর্মান্তিক ঘটনা এই চিত্রকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গত সোমবার কুমিল্লার দেবিদ্বারে নিজের মাকে কুপিয়ে এবং আছাড় দিয়ে আট মাস বয়সি ভাতিজিকে হত্যার অভিযোগে মো. ইমন (২৫) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় ইমনের ভাবি গুরুতর আহত হন। এর মাত্র দুদিন আগে কুমিল্লায় একটি আইফোনের জন্য ১৩ বছরের এক স্কুলছাত্রকে হত্যা করা হয়। এছাড়া খুলনায় ‘ভাত চুরির’ অপবাদে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মারার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার সাভারের আমিন বাজারে পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) এক উপপরিদর্শককে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সাভার, লক্ষ্মীপুর ও রংপুরে চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ড এবং পাবনায় ধর্ষণ মামলার আসামির বাড়িঘর ভাঙচুরের মতো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র জননিরাপত্তাকে মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৮-২০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যা তাদের আচরণগত সহনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতামত

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, আধুনিক আর্থসামাজিক বাস্তবতায় মানুষের মধ্যকার পারস্পরিক বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে। টিকে থাকার নিষ্ঠুর প্রতিযোগিতায় মানুষ এতটাই ব্যস্ত যে, অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দেখানোর মানসিকতা বা সময় আর অবশিষ্ট নেই। এর পাশাপাশি কিশোর ও তরুণদের একটি বড় অংশ মাদক এবং ডিভাইস আসক্তিতে জড়িয়ে পড়ার কারণে সংঘাত ও সহিংসতার ঘটনা বাড়ছে।

মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বলেন, ‘যৌথ পরিবার প্রথার বিলুপ্তি এবং তথ্যপ্রযুক্তির যত্রতত্র অপব্যবহার মানুষের মানসিক স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। ফেসবুক, টিকটক বা ইউটিউবের মতো প্ল্যাটফর্মগুলো কোনো সত্যতা যাচাই ছাড়াই ক্ষোভ ও ঘৃণা ছড়ানোর গতি বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষ সমঝোতা বা সহমর্মিতার মানসিকতা হারিয়ে আত্মকেন্দ্রিক ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।’

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুতগতির আধুনিক জীবন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব মানুষের মানসিক শান্তি কেড়ে নিচ্ছে। এই সংকট উত্তরণে নৈতিক শিক্ষা ও পারিবারিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আইনের শাসন কঠোরভাবে বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment