অন্যান্য

বন্যপ্রাণী নিয়ে লোকবিশ্বাস ও বাস্তবতা | দৈনিক পূর্বাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল

শিয়ালের মাংস, তক্ষক ও জোঁকের তেল নিয়ে প্রচলিত লোকবিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বন্যপ্রাণী সুরক্ষায় কুসংস্কার ও আইনি বাধ্যবাধকতা নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।

ঢাকা: শিয়ালের মাংস খেলে বাতের ব্যথা ভালো হয়, তক্ষক হাঁপানি থেকে শুরু করে যৌনক্ষমতা বাড়ায় কিংবা জোঁকের তেল সব ধরনের শারীরিক যন্ত্রণা নিরাময় করে—এ ধরনের নানা লোকবিশ্বাস ও অন্ধবিশ্বাস বাংলাদেশের সমাজে বহু বছর ধরে শিকড় গেড়ে আছে। ঐতিহ্যবাহী ওষুধ বা টোটকা চিকিৎসার কাঁচামাল হিসেবে এসব প্রাণীর চটজলদি চাহিদার কারণে প্রকৃতি থেকে এদের নিধন ও পাচার বেড়েই চলেছে। তবে বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব দাবির পেছনে বিন্দুমাত্র কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।

শিয়াল হত্যা ও লোকবিশ্বাসের নির্মম বাস্তবতা

গ্রামাঞ্চলে খেঁকশিয়াল বা পাতিশিয়াল দেখলেই সেগুলোকে অশুভ বা ক্ষতিকর মনে করে পিটিয়ে মারার ঘটনা প্রায়ই ঘটে। অনেকেরই ধারণা, শিয়ালের মাংস খেলে হাঁপানি কিংবা দীর্ঘস্থায়ী বাত ভালো হয়। সম্প্রতি বরিশালে কয়েকটি শিয়াল পিটিয়ে মারার পর স্থানীয়দের অনেকে দাবি করেছিলেন যে, রোগ মুক্তির আশায় সেগুলোর মাংস রান্না করে খাওয়া হয়েছে।

তবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ জানান, খেঁকশিয়াল সাধারণত মুরগি বা গৃহপালিত পশুপাখি খায়—এমন ধারণার পক্ষে কোনো জোরালো প্রমাণ নেই; বরং আকারে বড় হওয়ায় পাতিশিয়াল মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে। এদিকে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি ও ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল মুহিত স্পষ্ট করেছেন যে, শিয়ালের মাংসে কোনো ঔষধি গুণ রয়েছে—এমন কোনো আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বা ফার্মাকোলজির তথ্য কোথাও নেই। এগুলো সম্পূর্ণ কুসংস্কার মাত্র।

তক্ষকের চটকদার গুজব ও কোটি টাকার প্রতারণা

দীর্ঘদিন ধরেই তক্ষককে ঘিরে ক্যানসার বা দুরারোগ্য ব্যাধি সারানোর ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে কোটি টাকা দাম চাওয়ার প্রতারণা চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এর চড়া চাহিদার গুঞ্জন তুলে একশ্রেণির চক্র প্রকৃতি থেকে তক্ষক নিধন করে আসছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান উল্লেখ করেন, তক্ষক নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল কৃত্রিম গুজব তৈরি করেছে। তবে সচেতনতা বৃদ্ধির ফলে বর্তমানে মানুষ আগের চেয়ে অনেক কম প্রতারিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কাঁচা এসব প্রাণী বা দেহাবশেষ খাওয়ার ফলে শরীরে মারাত্মক বিষক্রিয়া ও অজানা রোগ ছড়িয়ে পড়ার বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে।

জোঁকের তেল বনাম চিরায়ত লিচ থেরাপি

শিয়াল বা তক্ষকের কার্যকারিতা প্রমাণিত না হলেও, প্রাচীন ইউনানি চিকিৎসায় জোঁকের ব্যবহার বৈজ্ঞানিকভাবে স্বীকৃত। হামদর্দ বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের আয়ুর্বেদিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. মো. মনির আহাম্মেদ জানান, সব জোঁক দিয়ে এই চিকিৎসা হয় না; এর জন্য বিশেষভাবে চাষ করা ও পরীক্ষিত ‘মেডিকেটেড’ জোঁক ব্যবহার করে শরীর থেকে দূষিত রক্ত বা পুঁজ অপসারণ করা হয় (লিচ থেরাপি)।

তবে ফুটপাতে বা হাটবাজারে হাতুড়ে চিকিৎসকদের চটকদার বিজ্ঞাপনে যে ‘জোঁকের তেল’ বিক্রি করা হয়, তার কোনো ঔষধি কার্যকারিতা নেই বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

আইন ও বাস্তব চিত্র

বাংলাদেশের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন’ অনুযায়ী খেঁকশিয়াল, পাতিশিয়াল ও তক্ষক সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। লাইসেন্স বা গবেষণা ছাড়া এগুলো শিকার বা কেনাবেচা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। বন অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এগুলো দমনে কাজ করলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের অপরাধ রোধে আইনের আরও কঠোর ও দৃশ্যমান প্রয়োগ জরুরি।

সোহেল হাওলাদার

নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment