নিজস্ব প্রতিবেদক | দৈনিক পূর্বাচল
প্রকাশিত: ০২ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা: প্রকাশিত হলো ২০২৬ সালের উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফল। দেশের শিক্ষা বোর্ডগুলোর ইতিহাসে এবারের ফলাফলে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। কাঙ্ক্ষিত ফলাফল না পেয়ে হতাশ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। এবারের এই বিপর্যয়ের পেছনে পড়াশোনায় অনীহা এবং ক্লাসে অনিয়মিত উপস্থিতির পাশাপাশি সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে স্মার্টফোনের প্রতি শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত আসক্তি ও প্রযুক্তির অপব্যবহার। অভিভাবক মহলের জোরালো দাবি—যেসকল শিক্ষার্থী স্মার্টফোন ও সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেদের দূরে রেখেছিল, তাদের ফলাফল তুলনামূলক অনেক ভালো হয়েছে।
ফলাফল বিপর্যয় এবং পরিসংখ্যানের চিত্র
চলতি বছর সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পাসের হার অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে, যা গত দুই দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন। কাঙ্ক্ষিত মান অর্জনে ব্যর্থ হয়ে লাখ লাখ শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। শিক্ষাবিদ ও অভিভাবক ফোরামগুলোর মতে, খাতার সঠিক মূল্যায়ন ও উত্তরপত্র কঠোরভাবে যাচাইয়ের ফলে প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন হয়েছে বটে, তবে শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং ভার্চুয়াল দুনিয়ায় ব্যস্ততা পড়াশোনায় বড় ধরনের দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রিলস, শর্টস ও গেমসের মায়াজাল: ডুবছে মেধা
মনোবিজ্ঞানী ও শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান প্রজন্মের একটি বড় অংশ পড়াশোনার টেবিল বাদ দিয়ে সারাদিন মোবাইল ফোনে ফেসবুক রিলস, টিকটক, ইউটিউব শর্টস এবং অনলাইন গেমসে বুঁদ হয়ে থাকছে। ৫ মিনিটের জন্য ফোন হাতে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পার করে দেওয়া যেন এক সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এর ফলে পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং রিভিশনের জন্য পর্যাপ্ত সময় থেকে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। ধারাবাহিক মনোযোগ বা ডিপ ফোকাস নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা কঠিন বিষয়গুলোতে বড় ব্যবধানে ফেল করছে।
অভিভাবক সমাজের পর্যবেক্ষণ ও উৎকণ্ঠা
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অভিভাবকরা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে জানিয়েছেন, যেসব পরিবার সন্তানদের হাতে খুব কম বয়সে বা অপ্রয়োজনে স্মার্টফোন তুলে দেয়নি, বা যারা কড়া নজরদারিতে রেখেছিল, তাদের সন্তানরা আশানুরূপ ভালো ফল করেছে।
মোহাম্মদপুরের এক অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সারাদিন চোখের সামনে ফোন নিয়ে বসে থাকে, পড়ার টেবিলে মনোযোগ নেই। ফল তো খারাপই হবে। যারা মোবাইল থেকে দূরে থেকে রুটিন মাফিক পড়েছে, তারা ঠিকই সফল হয়েছে।”
মোবাইল আসক্তি কাটিয়ে উত্তরণের উপায়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রযুক্তিকে পুরোপুরি বর্জন না করে এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। ফল বিপর্যয় এড়াতে এবং আগামী দিনে শিক্ষার্থীদের সঠিক পথে রাখতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন:
-
স্ক্রিন টাইম সীমিত করা: পড়ার টেবিলে স্মার্টফোন ব্যবহার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে।
-
পারিবারিক সচেতনতা: সন্তানদের সঙ্গে অভিভাবকদের খোলামেলা আলোচনা ও বন্ধুসুলভ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে যাতে তারা ভার্চুয়াল জগত থেকে বাস্তবমুখী পড়াশোনায় ফিরে আসে।
-
সহশিক্ষা কার্যক্রম: খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা এবং বই পড়ার অভ্যাস বাড়াতে হবে।
শিক্ষার্থীরা যাতে হতাশায় না ভুগে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে এবং ত্রুটিগুলো শুধরে নতুন উদ্যমে প্রস্তুতি নিতে পারে—এটাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
(প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন: সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল)


