অন্যান্য

আইফোনের লোভে ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতিমকে হত্যা: আমাদের সামাজিক অবক্ষয়ের এক করুণ চিত্র

দৈনিক পূর্বাচল

বিশেষ কলাম

একটি আইফোনের লোভে ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতিমকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। এই মর্মান্তিক ঘটনা ও সামাজিক অবক্ষয় নিয়ে বিশেষ কলাম। লেখক: সোহেল হাওলাদার।

ফোনটার নাম আইফোন। এজাতীয় দামি ফোনের প্রযুক্তিগত কেরামতি হয়তো সবার বোধগম্য নয়; অনেকের কাছেই সব মোবাইল ফোন সমান—যার এক মাথায় কথা বললে অন্য মাথায় শোনা যায়। কিন্তু ১৩ বছরের কিশোর অপ্রতিমের কাছে একটি আইফোনের আকর্ষণ ছিল অন্যরকম, যা হয়তো তার কাছে মহাবিশ্বের চেয়েও বড় ছিল। এ বয়সের একটা বড় মানসিক বৈশিষ্ট্য হলো, তারা নিজেদের আর শিশু মনে করতে চায় না। মায়ের ফোনটি নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তোলা বা সময় কাটানোর মধ্যে তারা কোনো অপরাধবোধ দেখে না। অপ্রতিমের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

গত শুক্রবার বিকালের ঘটনা। মায়ের আইফোনটি হাতে নিয়ে সে ঘর থেকে বের হয়েছিল। হয়তো তার মনে সামান্যই ধারণা ছিল যে, কিছু ছবি তুলে বন্ধুদের সঙ্গে একটু ঘুরে সন্ধ্যার আগেই সে ফিরে আসবে। মায়ের হয়তো খেয়ালই ছিল না সে কোথায় যাচ্ছে, কিংবা জানা থাকলেও মর্মান্তিক এই পরিণতির কথা কেউ ভাবেনি।

কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, অপ্রতিম আর ফিরল না। প্রথমে মা তেমন উদ্বিগ্ন হননি, ভেবেছিলেন এই বয়সের ছেলেরা একটু দেরিতেই ফেরে। এরপর দুশ্চিন্তা থেকে শুরু হয় ফোনকল ও চারদিকে খোঁজখুঁজি। কিন্তু কোথাও তার সন্ধান মেলেনি।

রাত বাড়তে থাকায় বাড়তে থাকে স্বজনদের উৎকণ্ঠা। একপর্যায়ে দিশাহারা মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছেলের ছবি দিয়ে আকুতিভরা পোস্ট দেন—‘আমার ছেলেকে বিকাল ৩টা থেকে খুঁজে পাচ্ছি না। আপনারা যে যেখান থেকে পারেন সহায়তা করেন। আপনাদের কাছে হাত জোড় করছি। আমার ছেলেকে বাঁচান।’ পরবর্তীতে আরেকটি হূদয়বিদারক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘আমার ছেলেরে আমি কই খুঁজব, জঙ্গলে নাকি পানিতে।’

পরদিন সকালে বাঁশ কাটতে যাওয়া কিছু শ্রমিক ঝোপঝাড়ের মাঝে তার নিথর দেহ খুঁজে পান। জঙ্গলে সে চুপচাপ শুয়ে ছিল, গায়ে ছিল সেই চেনা পাঞ্জাবি। কিন্তু যার টানে সে ঘর ছেড়েছিল—সেই দামি ফোনটি তার কাছে ছিল না। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, কেবল ওই আইফোনটির জন্যই এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। সামান্য ওজনের প্লাস্টিক আর কাচের টুকরোর মতো একটি যন্ত্রের কারণে ১৩ বছরের একটি তাজা প্রাণ চিরতরে ঝরে গেল। অপ্রতিমের মা এখন বুক চাপড়ে বিলাপ করে প্রশ্ন করছেন, ‘এটা কোন দেশ? আমি বাঁচব কীভাবে?’

আজ পৃথিবীর সবকিছুই যেন বড় বেশি অর্থহীন ঠেকে। অপ্রতিমের ছবির দিকে তাকালেই নিজের সন্তানের মুখটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। আমার সন্তানও তো ঠিক এই বয়সেরই দুরন্ত। কিন্তু আজ ভয়ের চোটে তাকে কোথাও একা যেতে দিই না; খাঁচায় বন্দি পাখির মতো আগলে রাখি। সে হয়তো মনে মনে রাগ করে, অভিমান করে। কিন্তু চারপাশের মানবসমাজে যে গভীর অবিশ্বাস বাসা বেঁধেছে, তার কোনো চিকিৎসা নেই। গভীর রাতে যখন চারপাশ নিস্তব্ধ হয়ে আসে, তখন আমি আমার সন্তানের মাথার কাছে গিয়ে দাঁড়াই। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শুনি। এই ছোট্ট শব্দটুকু ছাড়া পৃথিবীতে আর কোনো কিছুই আজ আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয় না।

সোহেল হাওলাদার

নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল

প্রধান নির্বাহী, জাস্টিস ফর ইনোভেটিভ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ (JIDS)

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment