দৈনিক পূর্বাচল
নব্বই দশকের ঢাকাই চলচ্চিত্রের নস্টালজিয়া ও সালমান শাহ, শাবনূর, মান্নাদের অভিনীত ১৫টি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের সেরা গানগুলোর ইতিহাস নিয়ে বিশেষ বিনোদন প্রতিবেদন।
নব্বই দশক মানেই এক সুদূর নস্টালজিয়া, যা বর্তমান প্রজন্মের কাছেও এক মায়াবী রোমাঞ্চ। সামাজিকভাবে সেই সময়টা ছিল সামষ্টিকতার। বিকেলে মাঠে গিয়ে ফুটবল খেলা, দল বেঁধে হলে গিয়ে সিনেমা দেখা, লাইব্রেরিতে সময় কাটানো আর পাড়া-কালচারের প্রাণবন্ত উপস্থিতি আজকের ডিজিটাল যুগে এক অলীক স্বপ্ন। শ্রমিক শ্রেণির ট্রেড ইউনিয়ন কিংবা ক্লাবগুলো ছিল শহর ও মফস্বলের মানুষের মিলনমেলা। এই দশকের বাংলা চলচ্চিত্রের গান শুধু সিনেমার অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল না; গানগুলো হয়ে উঠেছিল জীবনের ভাষা। রেডিওর অনুরোধের আসর কিংবা ক্যাসেট প্লেয়ারের ফিতা ঘুরিয়ে প্রিয় গান শোনার জন্য প্রতিটি বিকেলই ছিল অর্থবহ।
নব্বইয়ের দশকে ঢাকাই চলচ্চিত্রে জনপ্রিয়তার নতুন সংজ্ঞা তৈরি করেছিলেন সালমান শাহ, শাবনূর, মৌসুমী, মান্না, রিয়াজসহ একঝাঁক অমর তারকা। তাঁদের জাদুকরী পারফর্ম্যান্সে প্রাণ জুড়িয়েছিল দর্শকদের, আর সেই গানে সুর ও কণ্ঠের পসরা সাজিয়েছিলেন এন্ড্রু কিশোর, খালিদ হাসান মিলু, সাবিনা ইয়াসমিন, কনকচাঁপা, আগুন, আইয়ুব বাচ্চু ও সুবীর নন্দীদের মতো কিংবদন্তি শিল্পীরা।
সেই সোনালী অধ্যায়ের হাজারো জনপ্রিয় গান থেকে দৈনন্দিন বিনোদন পাঠকদের জন্য এলোমেলোভাবে বাছাই করা ১৫টি চলচ্চিত্রের অবিস্মরণীয় গান নিয়ে এই বিশেষ প্রতিবেদন।
-
ভালো আছি ভালো থেকো: ১৯৯৬ সালের ব্যবসাসফল ছবি ‘তোমাকে চাই’-এর এই গানটি রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহর লেখায় এবং এন্ড্রু কিশোর ও কনকচাঁপার কণ্ঠে অমর হয়ে আছে। সালমান শাহ ও শাবনূরের রসায়নের সঙ্গে গানটির প্রেম-বিরহের আবেগ আজও অমলিন।
-
এখন তো সময় ভালোবাসার: ২০ মার্চ ১৯৯৩ মুক্তিপ্রাপ্ত ঐতিহাসিক ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ ছবির এই গানে কণ্ঠ দিয়েছিলেন রুনা লায়লা ও আগুন। এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই বড় পর্দায় অভিষেক হয়েছিল সালমান শাহ ও মৌসুমীর।
-
এখানে দুজনে নিরজনে: ১৯৯৪ সালের আলোচিত ছবি ‘অন্তরে অন্তরে’-র এই গানে কণ্ঠ দিয়েছেন রুনা লায়লা ও এন্ড্রু কিশোর। আলম খানের সংগীত পরিচালনায় সালমান শাহ ও মৌসুমীর এই জুটির আবেদন আজও ফুরিয়ে যায়নি।
-
যে প্রেম স্বর্গ থেকে এসে: ১৯৯৭ সালের ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’ ছবির এই গানে কণ্ঠ দেন খালিদ হাসান মিলু ও কনকচাঁপা। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা ও সুরে রিয়াজ ও রবীনা ট্যান্ডন অভিনীত এই গানটি মানুষের মুখে মুখে ফিরত।
-
পড়ে না চোখের পলক: একই ছবি ‘প্রাণের চেয়ে প্রিয়’-র আরেকটি রোমান্টিক সৃষ্টি। এন্ড্রু কিশোরের গাওয়া এই গানে ঠোঁট মিলিয়ে চিত্রনায়ক রিয়াজ দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নেন।
-
শুধু একবার: ৩ মার্চ ১৯৯৫ মুক্তিপ্রাপ্ত ‘দেনমোহর’ ছবিতে সালমান শাহ ও মৌসুমীর রসায়ন দর্শকের মন জয় করেছিল। খালিদ হাসান মিলু ও সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে এই গানটি আজও স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল।
-
এই দিন সেই দিন: ১১ মে ১৯৯৫ মুক্তিপ্রাপ্ত ‘স্বপ্নের ঠিকানা’ ছবির এই গানটি রেডিও ও ক্যাসেটের কল্যাণে তরুণদের মুখে মুখে ছিল। সাবিনা ইয়াসমিন ও এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে গানটি নব্বইয়ের তারুণ্যের প্রতীক।
-
সাথী তুমি আমার জীবনে: ২০ ডিসেম্বর ১৯৯৬ মুক্তি পাওয়া ‘চাওয়া থেকে পাওয়া’ ছবির এই গানটি সালমান-শাবনূর জুটির স্বর্ণালি সময়ের নিখুঁত দলিল।
-
অনন্ত প্রেম তুমি দাও আমাকে: ৭ নভেম্বর ১৯৯৭ মুক্তিপ্রাপ্ত ‘লুটতরাজ’ ছবির মাধ্যমে ব্যান্ডতারকা আইয়ুব বাচ্চু চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক শুরু করেন। কনকচাঁপার সঙ্গে তাঁর এই দ্বৈত কণ্ঠের গানটি মান্না ও মৌসুমীর অভিনয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়।
-
আম্মাজান: ২৫ জুন ১৯৯৯ মুক্তিপ্রাপ্ত কাজী হায়াতের সাড়া জাগানো ছবি ‘আম্মাজান’। আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের কথা-সংগীতে এই টাইটেল গানটি ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক।
-
আমার মতো এত সুখী: ১৯৯৭ সালে রাজ্জাক পরিচালিত ‘বাবা কেন চাকর’ ছবির এই গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন খালিদ হাসান মিলু। মোহাম্মদ রফিকউজ্জামানের কথা ও আলাউদ্দিন আলীর সুরে গানটি আজও শ্রোতাদের কাঁদিয়ে যায়।
-
পাগল মন: দিলরুবা খানের গাওয়া তুমুল জনপ্রিয় এই গানটিকে কেন্দ্র করেই পরে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রে দিলরুবা খান ও আগুনের কণ্ঠে নতুন জুটি মেহেদী ও অন্তরা পর্দা মাতান।
-
প্রেমের সমাধি ভেঙে: ১৯৯৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বাপ্পারাজ ও শাবনাজ অভিনীত ‘প্রেমের সমাধি’ ছবির এই গানটি এন্ড্রু কিশোরের কণ্ঠে নব্বইয়ের অন্যতম সেরা আবেগঘন গান হিসেবে স্বীকৃত।
-
কী ছিলে আমার বলো না তুমি: মনি কিশোরের কণ্ঠে গাওয়া জনপ্রিয় এই গানটি ১৯৯৭ সালে ‘কে অপরাধী’ চলচ্চিত্রে ব্যবহারের পর আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়, যেখানে পর্দায় ছিলেন ওমর সানী ও শাবনূর।
-
তুমি মোর জীবনের ভাবনা: ১৯৯৭ সালের ‘আনন্দ অশ্রু’ ছবির এই গানটি রেডিওর অনুরোধের আসরে তুঙ্গে ছিল। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে সালমান শাহর জন্য এতে কণ্ঠ দেন এন্ড্রু কিশোর।
নব্বইয়ের এই গানগুলো কেবল কিছু সুরের মূর্ছনা ছিল না; এগুলো ছিল একটি প্রজন্মের আবেগ, ভালোবাসা ও স্মৃতির ক্যানভাস, যা আজও আমাদের নস্টালজিক করে তোলে।


