গাজীপুর প্রতিনিধি: দৈনিক পূর্বাচল
সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের দৃশ্যপট। আড়ালে খোলে দূষণের গোপন দুয়ার। কারখানার বিষাক্ত তরল বর্জ্য গিলে খাচ্ছে গাজীপুরের খাল, বিল ও নদী। পরিশোধন ছাড়াই গড়িয়ে পড়ছে গাঢ় কালো ও লালচে রাসায়নিক। বিষের তীব্রতায় নীল জনজীবন। বর্ষার স্রোতে কিছুটা আড়াল হলেও শুষ্ক মৌসুমে প্রকট হয়ে ওঠে দূষণের আসল রূপ।
টঙ্গী, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর ও বিসিক এলাকার খালগুলোতে বইছে বিষাক্ত রাসায়নিকের ফেনা। স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলেছে এখানকার জলপ্রবাহ। শুধু চিলাই নদী বা তুরাগ নয়, বিষ ছড়াচ্ছে আশপাশের সব জলধারায়। বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের পরিদর্শনে তুরাগ নদ দূষণের অন্তত ২২৪টি উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫৪টি শিল্পকারখানা, ৪২টি খাল-নালা, ১১৫টি গৃহস্থালি ও ১৩টি হাট-বাজার।
আইন অমান্যের মহোৎসব ও ইটিপি ফাঁকি
আইন অনুযায়ী শিল্প কারখানায় বর্জ্য শোধনাগার বা ইটিপি (ETP) থাকা বাধ্যতামূলক এবং প্রায় ৬৮০টি ওয়াশিং কারখানায় তা বসানোও হয়েছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, ইটিপি চালনার উচ্চ খরচের চেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের মাঝেমধ্যে জরিমানা দেওয়া কারখানা মালিকদের কাছে অনেক বেশি লাভজনক। ফলে খরচ বাঁচাতে গভীর রাতে বাইপাস লাইনের মাধ্যমে অপরিশোধিত বর্জ্য সরাসরি ফেলা হচ্ছে খাল-নদীতে।
গাজীপুর বারের আইনজীবী মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, “নদী ও পরিবেশ দূষণের কারণে পরিবেশ অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে জরিমানা আদায় করে। জরিমানা দেওয়ার পরের দিন ফের দূষণে নেমে পড়ে কারখানাগুলো। এক মাস ইটিপি বন্ধ রেখে যে পরিমাণ টাকা সাশ্রয় হয়, তার পরিবর্তে দু-তিন মাস পরপর জরিমানা দিলে কারখানার কোনো সমস্যা হয় না।”
কৃষি ও জীবিকার ওপর মারাত্মক আঘাত
বিষাক্ত এই পানির প্রভাবে ধ্বংস হচ্ছে কৃষি ও জীবিকা। বাসন বিল বা বাঘিয়া অঞ্চলের কৃষকরা এখন সোনা ফলানো জমিতে ফসল হারাচ্ছেন। পানিতে থাকা লেড, ক্রোমিয়াম ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু বিষিয়ে তুলছে ভূগর্ভস্থ পানিও। কৃষকদের ভাষ্যমতে, খালের দূষিত পানি সেচে ব্যবহার করলে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে যায়, পুড়ে যায় ফসলের চারা। এছাড়া নদী ও বিলে মাছ না থাকায় হাজারো জেলে ও মৎস্যজীবী তাদের জীবিকা হারাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান পরিবেশবিদ মুহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, “গাজীপুরের নদনদীগুলো ধারাবাহিকভাবে দূষিত হচ্ছে। পানিতে ভারী ধাতুর মাত্রা বেড়ে মানবদেহ ও জলজ প্রাণীর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। এ অঞ্চলে চর্মরোগ, ব্রংকাইটিস ও শ্বাসকষ্ট বাড়ছে। গাজীপুর দূষণে সংকটাপন্ন হলে ঢাকাও রক্ষা পাবে না, কারণ এটি রাজধানীর উজানের অঞ্চল।”
বাংলাদেশ পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (বাপা) গাজীপুর মহানগরীর সভাপতি হাসান ইউসুফ খান জানান, এখনই কঠোর নজরদারি ও আইনের প্রয়োগ না করলে খাল-নদীগুলো পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে। অন্যদিকে, গাজীপুর পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আরেফীন বাদল স্বীকার করেন যে সব কারখানাকে এখনো নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি, তবে মনিটরিং ও অভিযান জোরদার করা হচ্ছে।


