নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা: ৪ জুন, ২০২৬
ঢাকা: রাজধানীর মিরপুরে ৭৫ বছর বয়সী নূর জাহান বেগমের পচনধরা মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাটি সম্প্রতি দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সমাজের শীর্ষ স্তরে প্রতিষ্ঠিত ও উচ্চশিক্ষিত সন্তান থাকার পরও জীবনের শেষ দিনগুলোতে এই প্রবীণ মায়ের ভাগ্যে জুটেছে চরম একাকিত্ব, অবহেলা ও নির্মম পরিণতি। এই অমানবিক ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোড়ন সৃষ্টির পাশাপাশি প্রবীণ বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৩১ মে মিরপুর-১১ নম্বরের একটি ফ্ল্যাট থেকে নূর জাহান বেগমের পচা-গলা ও পোকা ধরা মরদেহ উদ্ধার করে পল্লবী থানা পুলিশ। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, মৃত নূর জাহান বেগম তাঁর স্কুলশিক্ষিকা মেয়ের সঙ্গেই ওই ফ্ল্যাটে থাকতেন। অথচ মা মারা যাওয়ার ৭-৮ দিন পার হয়ে গেলেও পাশের কক্ষে থাকা মেয়ে বিষয়টি টের পাননি বা কাউকে জানাননি। ঘরটির পরিবেশ ছিল অত্যন্ত নোংরা ও আবর্জনাপূর্ণ। পরবর্তীতে গত রবিবার এক নার্স এসে বৃদ্ধাকে মৃত অবস্থায় দেখার পর ‘৯৯৯’-এ কল দিলে পুলিশ গিয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।
এই করুণ মৃত্যুর পর জানা যায় নূর জাহান বেগমের সন্তানদের সামাজিক পরিচয়। তাঁর এক ছেলে সরকারের একজন যুগ্ম-সচিব (ড. এ কে এম আনিসুর রহমান, যাকে ঘটনার পর মোংলা বন্দর থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে), আরেক ছেলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এবং মেয়ে একজন স্কুলশিক্ষিকা। এমন একটি উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সদস্য হয়েও নূর জাহান বেগমের এই করুণ পরিণতি দেশের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এনে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী হাইকোর্টে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চেয়ে রিট দায়ের করেছেন।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আবারও দেশজুড়ে জোরালো আলোচনায় এসেছে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’ এবং এর কঠোর প্রয়োগের বিষয়টি।
কী বলছে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩’?
পিতা-মাতার আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ২০১৩ সালে এই আইনটি প্রণয়ন করা হয়। আইনের মূল দিকগুলো হলো:
-
ভরণপোষণ নিশ্চিতকরণ: প্রত্যেক সন্তানকে তাঁর পিতা-মাতার ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে। একাধিক সন্তান থাকলে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে এই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
-
একত্রে বসবাস: সন্তানদের পিতা-মাতার সঙ্গে একই স্থানে বসবাস নিশ্চিত করার চেষ্টা করতে হবে। কোনো সন্তান তাঁর পিতা বা মাতাকে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বৃদ্ধাশ্রম বা অন্য কোথাও থাকতে বাধ্য করতে পারবে না।
-
খোঁজখবর ও চিকিৎসা: পিতা-মাতার শারীরিক সুস্থতার নিয়মিত খোঁজ নেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার দায়িত্ব সন্তানের ওপর বর্তায়।
-
আলাদা থাকলে অর্থ প্রদান: পিতা-মাতা সন্তানদের থেকে আলাদা বসবাস করলে, সন্তানদের নিয়মিত তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে হবে এবং নিজের আয়-উপার্জনের সামর্থ্য অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ অর্থ ভরণপোষণের জন্য প্রদান করতে হবে।
-
দাদা-দাদী ও নানা-নানীর দায়িত্ব: পিতা-মাতার অনুপস্থিতিতে দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীর ভরণপোষণের দায়িত্বও সন্তানদের ওপর বর্তাবে।
আইন অমান্য করলে কী শাস্তি?
কোনো সন্তান যদি এই আইনের বিধান লঙ্ঘন করে বা পিতা-মাতার ভরণপোষণ না করে, তবে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
-
শাস্তি: এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে। অর্থদণ্ড অনাদায়ে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হতে পারে।
-
সহায়তাকারীর শাস্তি: কোনো সন্তানের স্ত্রী, স্বামী, সন্তান বা নিকটাত্মীয় যদি পিতা-মাতা, দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীর ভরণপোষণে বাধা সৃষ্টি করেন বা অসহযোগিতা করেন, তবে তাঁরাও অপরাধের সহায়তাকারী হিসেবে একই শাস্তির আওতায় আসবেন।
-
মামলার প্রকৃতি: আইন অনুযায়ী, এ ধরনের অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং আপোষযোগ্য।
আইনটির বাস্তব প্রয়োগ ও সচেতনতার তাগিদ
নূর জাহান বেগমের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সমাজে শুধু শিক্ষার হার বা পদের উন্নতি হলেই নৈতিকতার উন্নয়ন ঘটে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে চমৎকার একটি আইন থাকা সত্ত্বেও প্রচার ও প্রয়োগের অভাবে অনেকে এর সুবিধা পাচ্ছেন না। শুধু নৈতিক দায়িত্বের ওপর ছেড়ে না দিয়ে, এই আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এখন সময়ের দাবি। সচেতন মহলের মতে, আইন ও নৈতিকতার মেলবন্ধনই পারবে নূর জাহান বেগমের মতো আর কোনো প্রবীণ মা-বাবাকে জীবনের শেষ সময়ে এমন অবহেলা ও একাকিত্বের শিকার হওয়া থেকে রক্ষা করতে।

