ভারতীয় ঋণ প্রত্যাহার: মাঝপথেই থমকে গেল ১১ হাজার কোটি টাকার ৪ মেগা প্রকল্প

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক, দৈনিক পূর্বাচল |

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের ৪টি বড় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১১,৬৬২ কোটি টাকার ঋণ প্রত্যাহার করেছে ভারত। থমকে গেছে রেলের মেগা প্রকল্পগুলো। বিস্তারিত জানুন দৈনিক পূর্বাচলে।

দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে প্রতিশ্রুত ঋণের অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান অনীহা দেখাচ্ছে প্রতিবেশী দেশ ভারত। এই কূটনৈতিক ও কৌশলগত টানাপড়েনের মধ্যে বাস্তবায়নাধীন চারটি বড় উন্নয়ন প্রকল্প থেকে মাঝপথেই পর্যায়ক্রমে ১১ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা ঋণ প্রত্যাহার করে নিয়েছে দেশটি। ফলে সংকটে পড়েছে যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতের গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পগুলো।

তবে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, একক কোনো সিদ্ধান্তে নয়, বরং দুপক্ষের পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতেই এই অর্থ প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতি ও কূটনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ৫ আগস্টের পর তৈরি হওয়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের টানাপড়েনের কারণেই ভারত এই ঋণ প্রত্যাহার করে থাকতে পারে। বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং সরকারের এটি গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত।

কোন ৪ প্রকল্পে ভারতীয় ঋণ প্রত্যাহার?

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, ভারতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) অর্থ চলে যাওয়ায় প্রকল্পগুলোর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। ৪টি প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিচে তুলে ধরা হলো:

প্রকল্পের নাম মোট প্রাক্কলিত ব্যয় প্রত্যাহৃত ভারতীয় ঋণ বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
১. খুলনা-দর্শনা ডাবল লাইন রেলপথ ৩,৫০০ কোটি টাকা ২,৬৮৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা প্রকল্প সংশোধনের উদ্যোগ; বিকল্প ঋণের সন্ধান চলছে।
২. পার্বতীপুর-কাউনিয়া ডুয়েলগেজ রূপান্তর ১,৬৮৩ কোটি ২১ লাখ টাকা ১,৩৬৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা ২০১৮ থেকে চলমান এই প্রকল্পটি এখন বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করা হচ্ছে।
৩. ৩য় প্রকল্প (নাম অপ্রকাশিত) (বাকি অংশ) চীনের অর্থায়নে নতুনভাবে কাজ শুরু করার প্রক্রিয়া চলছে।
৪. ৪র্থ প্রকল্প (নাম অপ্রকাশিত) (বাকি অংশ) অর্থ সংকটে প্রকল্পটি বন্ধের তালিকায় রয়েছে।

উৎস: অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)

‘উভয়পক্ষের সম্মতিতেই সিদ্ধান্ত’ বলছে ইআরডি

ঋণ প্রত্যাহারের বিষয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও প্রকল্পগুলোর ধীরগতির কথা উল্লেখ করেছে ইআরডি। এ প্রসঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী সংবাদমাধ্যমকে বলেন:

“এটি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক টানাপড়েনের বিষয় কি না— তা এ মুহূর্তে সুনির্দিষ্টভাবে বলা যাচ্ছে না। তবে নানা জটিলতার কারণে প্রকল্পগুলোয় দীর্ঘদিন ধরে ধীরগতি বিরাজ করছিল। পরে ভারতীয় ঋণ প্রত্যাহারের বিষয়টি উভয়পক্ষ মিলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেননা একপক্ষ চাইলেই চুক্তি বাতিল বা ঋণ প্রত্যাহারের ক্ষমতা রাখে না।”

থমকে গেছে রেলের মেগা প্রকল্প

সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খেয়েছে রেলওয়ে খাত। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভারতের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ বাড়াতে হাতে নেওয়া হয়েছিল ১২৬ দশমিক ২৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘খুলনা-দর্শনা ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ’ প্রকল্প। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও এখন বিকল্প অর্থায়ন না মিললে কাজ স্থবির হয়ে পড়বে।

অন্যদিকে, উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৫৭ কিলোমিটারের ‘পার্বতীপুর-কাউনিয়া রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর’ প্রকল্পটি এখন পুরোপুরি বাতিলের খাতায় চলে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ঢাকার নতুন প্রশাসনের সাথে দিল্লির সম্পর্কের সমীকরণ কিছুটা বদলেছে। ভারত তাদের পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুত প্রকল্পগুলোর গতি ও উপযোগিতা পুনর্মূল্যায়ন করছে। বাংলাদেশকেও এখন একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল না থেকে দ্রুত বিকল্প উন্নয়ন সহযোগী (যেমন- এডিবি, বিশ্বব্যাংক বা অন্য উৎস) খোঁজার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 5   +   5   =