রামপুরায় ২৩ ছাত্র-জনতা খুনের নির্দেশদাতা ম্যাজিস্ট্রেট এখন আশুগঞ্জের ইউএনও! খোলস বদলে বহাল তবিয়তে বিতর্কিতরা

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক (দৈনিক পূর্বাচল):

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান দমাতে মাঠপর্যায়ে গুলির নির্দেশ দেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাফে মোহাম্মদ ছড়া এখন আশুগঞ্জের ইউএনও। খোলস বদলে এখনো বহাল তবিয়তে বিতর্কিত আমলারা। পড়ুন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান দমাতে মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নৃশংসভাবে গুলির নির্দেশ দেওয়া বিতর্কিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা বর্তমান সরকারের আমলেও বহাল তবিয়তে রয়েছেন। যাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার কথা ছিল, তাদেরই উল্টো গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করার এক চাঞ্চল্যকর চিত্র সামনে এসেছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জুলাইয়ে ঢাকার রামপুরায় ২৩ জন ছাত্র-জনতাকে গুলি করে হত্যার নির্দেশদাতা তৎকালীন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট রাফে মোহাম্মদ ছড়া বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) হিসেবে কর্মরত আছেন। শুধু তাই নয়, আশুগঞ্জে যোগদানের পর তার বিরুদ্ধে মেঘনা নদীতে বালু ডাকাতির সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এবং বসতভিটা ধ্বংসের মাধ্যমে হাজার হাজার সংখ্যালঘু পরিবারকে উচ্ছেদের মুখে ফেলার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ফলে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

তালিকা বিশ্লেষণে গা শিউরে ওঠা তথ্য

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ের সূত্র থেকে প্রাপ্ত ৯৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের তালিকা এবং তাদের বর্তমান পদায়ন বিশ্লেষণ করে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা এসব কর্মকর্তাই মূলত আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলির নির্দেশ দিয়েছিলেন। অভ্যুত্থানের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য গ্রেফতার হলেও অন্তরালে থেকে যাওয়া এই মূল নির্দেশদাতারা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

তৎকালীন সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার ‘ইতিবাচক’ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগ করা অথবা আওয়ামী লীগের অনুগত কর্মকর্তাদের বাছাই করে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে রাস্তায় নামানো হয়েছিল। কিন্তু সরকার পতনের পর তারা রাতারাতি খোলস বদলে প্রভাবশালী পদ বাগিয়ে নিয়েছেন।

তালিকায় থাকা আরও কয়েকজন বিতর্কিত কর্মকর্তা:

১. নিকারুজ্জামান (তালিকার ৫৭ নম্বর): মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই উপসচিব ২০ থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত রামপুরাসহ বিভিন্ন সহিংস এলাকায় ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে ছিলেন। তার বাবা চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এবং ছোট ভাই দক্ষিণ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। এর আগে কক্সবাজারের উখিয়ার ইউএনও থাকাকালে বিতর্কিত ‘রাতের ভোটে’ সহায়তার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ২. এস এম মুনিম লিংকন (তালিকার ৭৭ নম্বর) ও মো. আক্তারুজ্জামান (তালিকার ৮৫ নম্বর): মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের এই দুই সিনিয়র সহকারী সচিব যথাক্রমে জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহ এবং ১ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকার বিভিন্ন পয়েন্টে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে মাঠপর্যায়ে থেকে কঠোর ক্র্যাকডাউনে সক্রিয় ছিলেন। ৩. মোছা. আকলিমা বেগম (তালিকার ১ নম্বর): আন্দোলনের সময় ঢাকা ডিসি অফিসের সিনিয়র সহকারী কমিশনার থাকা এই কর্মকর্তাকে ৫ আগস্টের পর কৌশলগত কারণে টাঙ্গাইলের বাসাইল ইউএনও হিসেবে বদলি করা হয়। সম্প্রতি তাকে পুরস্কৃত করে সচিবালয়ে পদায়ন করা হয়েছে।

বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের দাবি

বিচারের পরিবর্তে বিতর্কিত আমলাদের এমন সুবিধাজনক পদায়ন নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জুলাই অভ্যুত্থানে সামনের সারিতে থাকা আন্দোলনকারী ও শহীদ পরিবারের সদস্যরা।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব জয়নাল আবেদীন শিশির এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক এবং উদ্বেগজনক। জুলাইয়ে আন্দোলনকারীদের গুলি করার নির্দেশ যাঁরা দিয়েছেন, তাঁদের বিচারের মুখোমুখি করার পরিবর্তে ভালো ভালো পদে বসিয়ে রাখা হয়েছে। আশুগঞ্জের ইউএনও রাফে মোহাম্মদ ছড়া এর বড় প্রমাণ। সরকারকে দ্রুত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে প্রশাসনের দোষী কর্মকর্তাদের বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় এমন বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবারও ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটাবে।’

বিপ্লবী ছাত্র-জনতা ও সচেতন মহল অবিলম্বে এই ৯৫ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ফৌজদারি কার্যবিধিতে গ্রেফতার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 1   +   3   =