সীমানা পেরিয়ে: বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের জয়জয়কার

বিনোদন ডেস্ক, দৈনিক পূর্বাচল:

জয়া আহসান, আরিফিন শুভ, মোশাররফ করিম থেকে শুরু করে হলিউডের অস্কারজয়ী নাফিস বিন জাফর—বিশ্ব বিনোদন ও চলচ্চিত্র মাধ্যমে কীভাবে রাজত্ব করছেন বাংলাদেশীরা? পড়ুন দৈনিক পূর্বাচলের বিশেষ প্রতিবেদন।

সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব বিনোদন অঙ্গনে এখন সগৌরবে উড়ছে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা। অভিনয়, গান আর ক্যামেরার পেছনের জাদুতে দুই বাংলা থেকে শুরু করে বলিউড, হলিউড ও কোরিয়ান ইন্ডাস্ট্রিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশী ও বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তারকারা।

ওপার বাংলায় রাজত্ব

দুই বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী জয়া আহসান ২০১৩ সালের ‘আবর্ত’ দিয়ে পশ্চিমবঙ্গে যাত্রা শুরু করে ‘বিসর্জন’, ‘দেবী’, ‘দশম অবতার’ ও সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত ‘আজও অর্ধাঙ্গিনী’র মতো কালজয়ী সিনেমা উপহার দিয়েছেন। কলকাতার মর্যাদাপূর্ণ ‘ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ডস’ জয় করেছেন চারবার। মুক্তির অপেক্ষায় আছে তাঁর নতুন ছবি ‘কালান্তর’।

জয়ার পাশাপাশি ওপার বাংলায় এখন নিয়মিত মুখ হয়ে উঠেছেন অন্য বাংলাদেশীরাও। ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি’ ওয়েব সিরিজে নজর কেড়েছেন আজমেরী হক বাঁধন। অন্যদিকে প্রথম সিনেমা ‘আরও এক পৃথিবী’ দিয়েই ফিল্মফেয়ারের সেরা নবীন অভিনেত্রীর পুরস্কার লুফে নিয়েছেন তাসনিয়া ফারিণ। নিজের গ্ল্যামারের দ্যুতি ছড়িয়েছেন নুসরাত ফারিয়া, আর ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ সিনেমা দিয়ে দারুণ প্রশংসা কুড়িয়েছেন কাজী নওশাবা আহমেদ

টালিউডে শক্তিশালী অবস্থান গড়েছেন বাংলাদেশের অভিনেতারাও। ২০২৪ সালে কিংবদন্তি মৃণাল সেনের বায়োপিক ‘পদাতিক’ দিয়ে ওপার বাংলায় বাজিমাত করেছেন চঞ্চল চৌধুরী। তাঁর অভিনীত ‘শেকড়’ ও ‘আজাদি’ মুক্তির অপেক্ষায়। এছাড়া ‘ডিকশনারি’ ও ‘হুব্বা’ দিয়ে কলকাতায় অভিনয় নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখেছেন নন্দিত অভিনেতা মোশাররফ করিম

বলিউড জয় ও সুরের মূর্ছনা

সাম্প্রতিক সময়ে বলিউডে বাংলাদেশের উপস্থিতি দারুণভাবে আলোচিত হচ্ছে। ২৫ বছর আগে ফেরদৌস ‘মিট্টি’ নামের হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছিলেন। সম্প্রতি বিশাল ভরদ্বাজের ‘খুফিয়া’ ছবিতে বাঁধন এবং অনিরুদ্ধ রায় চৌধুরীর ‘কড়ক সিং’ দিয়ে জয়া আহসান হিন্দি সিনেমায় পা রাখেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে বড় চমক আরিফিন শুভ। সনি লিভের ঐতিহাসিক ওয়েব সিরিজ ‘জ্যাজ সিটি’র কেন্দ্রীয় চরিত্রে প্রথম বাংলাদেশী অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করে বলিউডের মূলধারায় ইতিহাস গড়েছেন তিনি।

এদিকে বলিউডে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন বলা যায় আন্তর্জাতিক কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা-কে। সত্তরের দশকে তাঁর গাওয়া ‘ও মেরা বাবু চেইল ছেবিলা’ বা ‘দো দিওয়ানে’ আজও শ্রোতাদের মুখে ফেরে। এরপর ২০০৫ সালে ‘গ্যাংস্টার’ ছবিতে ‘ভিগি ভিগি’ গান দিয়ে পুরো ভারতে ঝড় তোলেন নগরবাউল জেমস। পরবর্তীতে ‘চল চলে’ ও ‘আলবিদা’র মতো কালজয়ী গান উপহার দেন তিনি। বলিউডে একটি গান গেয়েছেন প্রয়াত প্লেব্যাক সম্রাট এন্ড্রু কিশোর-ও। এছাড়া ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী মঞ্চে পারফর্ম করে বিশ্বসংগীতের আসরে বাংলাদেশকে রিপ্রেজেন্ট করেছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন সংগীতশিল্পী সঞ্জয় দেব

হলিউড ও ওশেনিয়া জয়

বাংলাদেশ থেকে হলিউডে অভিনয়ের প্রথম দুয়ার খুলেছিলেন আশির দশকের অভিনেত্রী নায়লা আজাদ নূপুর। ১৯৯৮ সালে ‘স্টর্ম ইন দ্য আফটারনুন’ দিয়ে যাত্রা শুরু করে পরবর্তীতে হ্যারিসন ফোর্ডের সাথে ‘ক্রসিং ওভার’ (২০০৯) চলচ্চিত্রে অভিনয় করেন তিনি।

হলিউড ও ব্রিটিশ বিনোদন মাধ্যমে নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করছেন তরুণ অভিনেতা রমজান মিয়া। বিশ্বকাঁপানো ‘বার্বি’, ‘এনোলা হোমস ২’ এবং এইচবিওর জনপ্রিয় সিরিজ ‘হাউজ অব দ্য ড্রাগন’-এ দেখা গেছে তাঁকে। অন্যদিকে, অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার টেলিভিশন ও মঞ্চে দাপটের সাথে কাজ করছেন সিডনিতে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত শিল্পী অর্ক। ২০২১ সালের প্রশংসিত ছবি ‘হিয়ার আউট ওয়েস্ট’-এ প্রধান চরিত্রে অভিনয়ের পাশাপাশি সহ-চিত্রনাট্যকার হিসেবেও কাজ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়িয়েছেন তিনি।

কোরিয়া প্রবাসী শ্রমিক থেকে নায়ক

একদম ভিন্ন এক রূপকথার জন্ম দিয়েছেন মাহবুব আলম। ১৯৯৯ সালে প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়ে আজ তিনি সেখানকার জনপ্রিয় চিত্রনায়ক। কোরিয়ান সিনেমা ‘বান্ধবী’ ও ‘হোয়্যার ইজ রনি’র কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে ব্যাপক পরিচিতি পান তিনি। অন্যদিকে খুলনার ছেলে সজল মাহমুদ (কোরিয়ান নাম সজল কিম) কে-ড্রামা জগতে পরিচিত নাম। জনপ্রিয় কোরিয়ান সিরিজ ‘ওয়েলকাম টু সামডাল-রি’সহ একাধিক ড্রামায় অভিনয় করেছেন তিনি।

ক্যামেরার পেছনের অস্কার জয়ীরা

শুধু পর্দার সামনেই নয়, ক্যামেরার পেছনেও রয়েছে বাংলাদেশীদের রাজত্ব। হলিউডে প্রথম বাংলাদেশী হিসেবে দুটি অস্কার জিতেছে ভিজ্যুয়াল ইফেক্টস (VFX) বিশেষজ্ঞ নাফিস বিন জাফর। ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’, ‘কুংফু পান্ডা ২’, ও ‘ট্রান্সফরমার্স’-এর মতো বিশ্বখ্যাত ছবিতে কাজ করেছেন তিনি।

আরেক ট্রেইলব্লেজার ওয়াহিদ ইবনে রেজা ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা: সিভিল ওয়ার’ ও ‘গেম অব থ্রোনস’-এর মতো মেগা প্রজেক্টের ভিএফএক্সে কাজ করেছেন। সম্প্রতি তাঁর নির্মিত অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র ‘আফটার আস’ জাপানে পুরস্কৃত হয়েছে। এছাড়া হলিউডের ‘দ্য ব্যাটম্যান’ কিংবা ‘অ্যাভাটার: দ্য ওয়ে অব ওয়াটার’র মতো ব্লকবাস্টার সিনেমার ট্রেলার তৈরি করে নেপথ্য কারিগর হিসেবে সুনাম কুড়াচ্ছেন কুমিল্লার ছেলে কামরুল হাসান

সীমানা পেরিয়ে বিশ্ব বিনোদন অঙ্গনে বাংলাদেশীদের এই জয়যাত্রা আগামী প্রজন্মের জন্য তৈরি করছে নতুন এক দিগন্ত।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 1   +   3   =