— দৈনিক পূর্বাচল বিশেষ প্রতিবেদন
স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’ এর নায়ক এবং ৭১-এর ঢাকা অঞ্চলের গেরিলা কমান্ডার কামরুল আলম খান খসরুর জীবনের অজানা গল্প নিয়ে দৈনিক পূর্বাচলের বিশেষ প্রতিবেদন। জানুন তাঁর ঐতিহাসিক অবদান ও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা পাওয়ার ইতিবৃত্ত।
ঢাকা: স্বাধীন বাংলাদেশের বুকে দাঁড়িয়ে যে কজন মানুষ অস্ত্র আর সেলুলয়েডের ফিতায় সমানভাবে ইতিহাস বুনেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম বীর মুক্তিযোদ্ধা কামরুল আলম খান খসরু। মহান মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোর অকুতোভয় এই সৈনিক একদিকে যেমন ছিলেন ঢাকা অঞ্চলের গেরিলা বাহিনীর অন্যতম প্রধান কমান্ডার, অন্যদিকে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’-এর কালজয়ী নায়ক। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও রূপালী পর্দায় প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘বাদশা’-তে দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করে তিনি ইতিহাস গড়েছেন। ২০২২ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন ঐতিহাসিক ‘আজীবন সম্মাননা’য়।
উত্তাল ১৯৭১ সালের মার্চ মাস থেকে শুরু করে সেলুলয়েডের রূপালী পর্দা—সবখানেই খসরু এক জীবন্ত কিংবদন্তি। দৈনিক পূর্বাচলের পাঠকদের জন্য আজ তুলে ধরা হলো এই মহানায়কের জীবনের কিছু গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়।
রাতের আঁধারে পতাকার কাপড় সংগ্রহ ও ঐতিহাসিক ২রা মার্চ
বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের ২রা ও ৩রা মার্চ স্বর্ণাক্ষরে লেখা। আর এই ইতিহাসের নেপথ্যের কারিগরদের একজন কামরুল আলম খান খসরু। তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সক্রিয় ও শীর্ষস্থানীয় সদস্য হিসেবে তিনি ‘নিউক্লিয়াস’-এর সাথে যুক্ত ছিলেন। ১লা মার্চের উত্তাল পরিস্থিতির পর স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম পতাকা তৈরির গুরুদায়িত্ব পড়েছিল যে কজন ছাত্রনেতার ওপর, খসরু ছিলেন তাদের অন্যতম।
তিনি নিজের জীবন বাজি রেখে রাতের আঁধারে কারফিউ ও পাকিস্তানি সেনাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে পতাকার জন্য কাপড় কিনে আনেন। সেই কাপড় দিয়েই তৈরি হয় আমাদের প্রথম জাতীয় পতাকা, যা পরবর্তীতে ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং ৩রা মার্চ পল্টন ময়দানে লাখো জনতার সামনে উত্তোলিত হয়েছিল। শুধু তা-ই নয়, রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের প্রাক্কালে তিনি রাইফেল উঁচিয়ে আকাশে গুলি ছুড়ে পরিষ্কার বার্তা দিয়েছিলেন—বাঙালি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত, শুধু পরম নেতার চূড়ান্ত নির্দেশনার অপেক্ষা।
ঢাকা অঞ্চলের গেরিলা কমান্ডার থেকে সেলুলয়েডের নায়ক
২৫শে মার্চের কালোরাত্রির পর যখন যুদ্ধ শুরু হয়, কামরুল আলম খান খসরু ঢাকা অঞ্চলের ক্র্যাক প্লাটুন ও গেরিলা বাহিনীর কমান্ডিং পজিশনে থেকে শত্রুদের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর, সেই যুদ্ধের তাজা স্মৃতি আর সত্যিকারের রণাঙ্গনকে সেলুলয়েডে বন্দি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
পরিচালক চাষী নজরুল ইসলামের পরিচালনায় নির্মিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘ওরা ১১ জন’। এই সিনেমায় খসরু শুধু প্রধান নায়কের ভূমিকায় অভিনয়ই করেননি, বরং তার হাত ধরেই সিনেমাটিতে মুক্তিযুদ্ধের বাস্তব ও সত্যিকারের অনেক ঐতিহাসিক ফুটেজ ব্যবহৃত হয়েছিল, যা চলচ্চিত্রটিকে এক অনন্য দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘বাদশা’ এবং দ্বৈত চরিত্র
‘ওরা ১১ জন’ দিয়ে রুপালী পর্দায় ঝড় তোলার পর খসরু নিজেকে প্রমাণ করেন তৎকালীন বাণিজ্যিক সিনেমার অন্যতম শীর্ষ তারকা হিসেবে। স্বাধীন বাংলাদেশের সম্পূর্ণ প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র ‘বাদশা’-তে তিনি প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন। এই সিনেমায় তিনি দ্বৈত (Double Role) চরিত্রে অভিনয় করে তৎকালীন সময়ে দর্শকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি: আজীবন সম্মাননা
চলচ্চিত্র শিল্পে এবং দেশের সংস্কৃতিতে অনন্য ও অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কামরুল আলম খান খসরুকে ২০২২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘আজীবন সম্মাননা’ প্রদান করে।
আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইন্ডাস্ট্রি যে কজন কালজয়ী মানুষের ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে, কামরুল আলম খান খসরু তাদের মধ্যে অন্যতম প্রধান এক স্তম্ভ। বীরের বেশে যিনি রণাঙ্গন কাঁপিয়েছেন, নায়কের বেশে জয় করেছেন কোটি মানুষের মন— দৈনিক পূর্বাচলের পক্ষ থেকে এই মহান বীর ও অভিনেতার প্রতি রইল বিনম্র শ্রদ্ধা।

