দেশ ছাড়ার মরিয়া চেষ্টায় বসুন্ধরা গ্রুপ: দুদককে পাশ কাটিয়ে ‘প্যাকেজ ডিল’ ও চার্টার্ড বিমান প্রস্তুতের চাঞ্চল্যকর তথ্য

বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল ঢাকা | শনিবার, ১১ জুলাই

হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার ও ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে অবরুদ্ধ বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানসহ ৫ সদস্যের দেশ ছাড়ার মরিয়া চেষ্টা। সরকারের শীর্ষ মহলে ২০ কোটি টাকার ‘প্যাকেজ ডিল’ ও চার্টার্ড বিমান প্রস্তুতের চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে দৈনিক পূর্বাচলের বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

ঢাকা: দুর্নীতি, হাজার হাজার কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ জালিয়াতি ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান (শাহ আলম) এবং তার পরিবারের চার সদস্য যেকোনো মুহূর্তে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে পারেন বলে গভীর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের ঘনিষ্ঠ এই শিল্পগোষ্ঠীর কর্ণধারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সিআইডি কঠোর অবস্থান নিলেও, তারা এখন নানা আইনি ফাঁকফোকর এবং প্রভাব খাটিয়ে দেশত্যাগের মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছেন। গোয়েন্দা ও নির্ভরযোগ্য সূত্রমতে, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের এই গোপন মিশনের জন্য অন্তত ২০ কোটি টাকার একটি বিশেষ বাজেট বা ‘প্যাকেজ ডিল’ প্রস্তুত করা হয়েছে।

দুদক ও আদালতের নিষেধাজ্ঞা

বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং ব্যাংক ঋণের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে ২০২৪ সালের ২১ অক্টোবর আদালত বসুন্ধরা পরিবারের ৮ সদস্যের ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এদের মধ্যে ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীরসহ তিন সদস্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের আগেই সুকৌশলে দেশ ছাড়েন। বর্তমানে দেশে অবরুদ্ধ থাকা বাকি ৫ সদস্য— চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান, তার স্ত্রী আফরোজা বেগম, ভাইস চেয়ারম্যান সাফওয়ান সোবহান, সাদাত সোবহান ও সাফিয়াত সোবহান সানভীরের ওপর কঠোর ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এছাড়া সিআইডি ও বিএফআইইউ তাদের ৭০টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, বিভিন্ন কোম্পানির ১৪৫৮ কোটি টাকার শেয়ার এবং বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি অবরুদ্ধ করে রেখেছে।

‘প্যাকেজ ডিল’ ও হাইকোর্টের কৌশল

সূত্র জানায়, নিম্ন আদালত ও হাইকোর্টের একটি বেঞ্চে দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আবেদন খারিজ হওয়ার পর, বসুন্ধরা গ্রুপ এখন সরকারের শীর্ষ আইন কর্মকর্তার কার্যালয় এবং কিছু পদস্থ কর্মকর্তাকে ব্যবহার করে কার্যসিদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছে। অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে অ্যাটর্নি জেনারেলের ব্যক্তিগত চেম্বারের জুনিয়র আইনজীবী মামুন চৌধুরীকে প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ করে হাইকোর্টে নতুন করে একটি ‘ক্রিমিনাল রিভিশন’ (নং-৩৫৩৭/২০২৬) দায়ের করা হয়েছে।

বসুন্ধরা গ্রুপ হাইকোর্টে এমন একটি বেঞ্চ খুঁজছে যেখানে দুদকের কোনো জোরালো বিরোধিতা থাকবে না। সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, বর্তমানে কমিশনে ‘কমিশনার’ না থাকায় সুনির্দিষ্ট মামলার জন্য নতুন আইনজীবী নিয়োগ করতে পারছে না দুদক। আর এই প্রশাসনিক শূন্যতাকে কাজে লাগিয়ে দুদককে পাশ কাটিয়ে আদালত থেকে একটি একতরফা আদেশ নেওয়ার ছক কষেছে বসুন্ধরা।

সাফওয়ান সোবহানের একক জালিয়াতি ও আন্তর্জাতিক কানেকশন

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শুধু গ্রুপভিত্তিক অপরাধই নয়, চেয়ারম্যানের পুত্র সাফওয়ান সোবহানের একক দুর্নীতির খতিয়ানও দীর্ঘ। যুক্তরাজ্য, দুবাই ও সিঙ্গাপুরে অফশোর কোম্পানি খুলে লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ১০ মিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের বিলাসবহুল প্রাসাদ ‘১৪ উইকম্প স্কয়ার’ ক্রয়ের তথ্য পেয়েছে সংস্থাগুলো। সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, নামমাত্র মূল্যের সম্পদ বন্ধক রেখে বসুন্ধরা গ্রুপ বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকারও বেশি ঋণ নিয়ে পাচার করেছে। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক থেকেই নিয়ম লঙ্ঘন করে ১ হাজার ৩২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের সহকারী পরিচালক মো. মাহমুদুল হাসান ভুঁইয়ার বাদী হওয়া মামলায় আহমেদ আকবর সোবহানসহ ২৬ জনকে আসামি করা হয়েছে।

প্রস্তুত চার্টার্ড বিমান, যেকোনো সময় পলায়নের আশঙ্কা

আদালতে দেওয়া আবেদনে বসুন্ধরা গ্রুপ ‘ব্যবসায়িক জরুরি মিটিং ও এমওইউ চুক্তি’র অজুহাত দেখালেও সরকারের বিশেষ পিপি আদালতে জোর আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, আসামিরা দেশ ছাড়লে আর কখনো ফিরবেন না। গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, হাইকোর্ট থেকে যেকোনো উপায়ে একটি শিথিল আদেশ বা স্থগিতাদেশ পেলেই আগে থেকে ভাড়াকৃত বিশেষ ‘চার্টার্ড বিমানে’ চড়ে দেশ ছাড়বেন আহমেদ আকবর সোবহান ও তার পরিবার। রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুণ্ঠনকারী এই শীর্ষ ঋণখেলাপিদের পলায়ন ঠেকাতে ইমিগ্রেশন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞরা।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 10   +   6   =