সোহেল হাওলাদার, নির্বাহী সম্পাদক.দৈনিক পূর্বাচল
দেশের রাজনীতিতে দলছুট ও সুবিধাবাদী নেতাদের পরিণতি সবসময়ই এক। বিএনপি থেকে বের হয়ে কিংবা দলটির বিরোধিতা করে শাহজাহান ওমর, বি চৌধুরী, কর্নেল অলি কিংবা তৈমুর আলম খন্দকাররা আজ রাজনৈতিকভাবে কোথায়? ইসহাক সরকার কিংবা রুমিন ফারহানাদের সাম্প্রতিক দাম্ভিকতা ও অবস্থান নিয়ে বিস্তারিত।বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি চিরন্তন সত্য বারবার সামনে আসে—ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, আর দলের চেয়ে বড় আদর্শ। সময়ের পরিক্রমায় অনেক হেভিওয়েট ও প্রতাপশালী নেতা দল পরিবর্তন করেছেন, মূল স্রোতের বিরুদ্ধে গিয়ে হম্বিতম্বি করেছেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা রাজনীতির অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছেন। পক্ষান্তরে, আদর্শের ওপর ভিত্তি করে টিকে থাকা দলগুলো ঠিকই ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে এসেছে।
এর সবচেয়ে বড় ও বাস্তব উদাহরণ বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। বিএনপি থেকে বের হয়ে একসময় ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর হুঙ্কার দিয়ে বলেছিলেন, ‘রিমোট কন্ট্রোল দিয়ে একটা দল চলতে পারে না।’ এমনকি তিনি বিএনপির রাজনৈতিক সমাপ্তিও দেখে ফেলেছিলেন। কিন্তু নিয়তির পরিহাস, সেই তথাকথিত ‘রিমোট কন্ট্রোলে’ চালিত বিএনপিই আজ রাষ্ট্রক্ষমতায়। তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, আর দলবদলু শাহজাহান ওমরের জায়গা হয়েছে কারাগারের অন্ধ প্রকোষ্ঠে।
অনুরূপ চিত্র দেখা গেছে বীর বিক্রম কর্নেল (অব.) অলি আহমদের ক্ষেত্রেও। দল ছাড়ার পর বেগম খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানকে নিয়ে হেন কোনো তুচ্ছতাচ্ছিল্য বক্তব্য নেই, যা তিনি দেননি। সর্বশেষ নিজেকে রাতারাতি স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবেও দাবি করেছিলেন। অথচ, সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে এই প্রবীণ রাজনীতিক নিজ এলাকাতেই জনগণের কাছে নিগৃহীত হয়েছেন। আজ তিনি যাদের পক্ষে ‘ভাড়ায় খাটছেন’, একসময় তাদেরই সকাল-বিকাল গালিগালাজ করতেন।
একই পরিণতি হয়েছিল সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর (বি চৌধুরী)। নিজেকে জিয়া পরিবারের চেয়েও জনপ্রিয় মনে করে তিনি দল গড়েছিলেন, আজীবন ‘বিকল্প’ রাজনীতির কথা বলে গেছেন। আজ নতুন প্রজন্মের অনেকে তার নামও জানে না। তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, হারিয়ে গেছেন রাজনৈতিক ইতিহাস থেকেও। অন্যদিকে, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হয়ে অন্য দলের মহাসচিব হওয়া তৈমুর আলম খন্দকারও আজ রাজনৈতিকভাবে অস্তিত্ব সংকটে।
ইতিহাসের এই নির্মম বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন উঠছে—যেখানে শাহজাহান ওমর, বি চৌধুরী বা কর্নেল অলির মতো বাঘা বাঘা নেতারা বিএনপির কোনো ক্ষতি করতে পারেননি, সেখানে ইসহাক সরকারের মতো কনিষ্ঠ নেতাদের হুমকি কতটুকু অর্থবহ?
গত নির্বাচনে নিজ এলাকায় জামানত হারানো ইসহাক সরকারের ১৭ বছরের রাজনৈতিক ত্যাগের প্রতি তৃণমূলের সম্মান আছে বলেই হয়তো অনেকে চুপ আছেন। কিন্তু যে দলের হয়ে তিনি আজ দালালি করছেন, সময়ের বিবর্তনে সেই দলের অস্তিত্ব এবং তার নিজের অবস্থান—উভয়ই যে ওমরের মতো ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই।
পাশাপাশি আলোচনা চলছে সাবেক বিএনপি নেতা রুমিন ফারহানার অহংকার ও দাম্ভিকতা নিয়েও। দল ছাড়ার পর সংসদে তার সাম্প্রতিক আচরণ ও বক্তব্য সাধারণ মানুষকে অবাক করেছে। প্রশ্ন উত্তর পর্ব না থাকা সত্ত্বেও স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীকে নিয়ে তার করা মন্তব্য কেবল সংসদীয় শিষ্টাচারকেই ক্ষুণ্ণ করেনি, বরং তার ভেতরের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বকেও প্রকাশ করেছে।
রাজনীতির নির্মম সত্য হলো—ব্যক্তি সাময়িক সুবিধা বা ক্ষমতার দম্ভে লম্ফঝম্প করতে পারে, কিন্তু দিনশেষে সুবিধাবাদীরা হারিয়ে যায়। শাহজাহান ওমর কিংবা কর্নেল অলিরা যার প্রমাণ। ব্যক্তি হারিয়ে গেলেও ‘বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ’ এবং এর মূল চালিকাশক্তি বিএনপি ঠিকই রাজনীতির মাঠে সদর্পে টিকে আছে এবং থাকবে।

