বিশেষ প্রতিবেদন।
ক্ষমতার চূড়া থেকে একসময়ের গণজাগরণ মঞ্চের আলোচিত নেতার চরম পতন এবং ১% ভোটারের সমর্থন না পেয়ে মনোনয়নপত্র বাতিলের নির্মম পরিণতি
সময়ের আবর্তনে কত রাজনীতিক ও নেতার উত্থান-পতন দেখেছে এ দেশের মানুষ। কিন্তু ক্ষমতার চূড়া থেকে অতল গহ্বরে পতনের এমন নির্মম ও নাটকীয় উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। একসময় যিনি ছিলেন রাজপথের ‘মহাতারকা’, যার সুরক্ষায় নিয়োজিত ছিল রাষ্ট্রীয় বাহিনী, যার ইশারা ও একটিমাত্র শব্দ শোনার জন্য শত শত গণমাধ্যমকর্মী অপেক্ষা করতেন—আজ তিনি শুধুই এক নিঃসঙ্গ, উপেক্ষিত এবং ধিকৃত চরিত্র। রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়ে চরম সুবিধাবাদিতার যে খেসারত তাকে দিতে হচ্ছে, তা এখন জনমুখে এক বড় নৈতিকতার দলিল।
ক্ষমতার চূড়ায় যখন ‘আরেক সরকার’
গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের ঢেউয়ে আকস্মিক উত্থান ঘটেছিল তার। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন সরকার তাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে অকাতরে রাষ্ট্রীয় অর্থ ও সুযোগ-সুবিধা ঢেলে দিয়েছিল। বিশ্বস্ত সূত্রের দাবি, তার প্রতিদিনকার ভরণপোষণ, তারকা হোটেলের বিলাসবহুল বুকিং এবং চিকিৎসার পেছনে সরকারের কোষাগার থেকে দৈনিক লাখ টাকারও বেশি ব্যয় করা হতো।
শুধু তাই নয়, তার ব্যক্তিগত চলাচলের জন্য কোটি টাকার বিলাসবহুল গাড়ি, কঠোর নিরাপত্তা বলয় এবং বিশেষ পিএস-এর সুবিধাও ছিল। তৎকালীন প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর পরিবারের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তখন চাউর ছিল নানা মুখরোচক গল্প। মন্ত্রীদের চেয়েও যেন বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন তিনি—অনেকের চোখে যা ছিল ‘সরকারের ভেতরে আরেক সরকার’।
ক্ষমতার অবসান ও ভাগ্যের নির্মম পরিহাস
কিন্তু ক্ষমতার এই রমরমা অবস্থা চিরস্থায়ী হয়নি। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের সাথে সাথে ব্যবহারের পর ছুড়ে ফেলার চিরন্তন নিয়তির মুখোমুখি হতে হয় তাকে। প্রথম ধাক্কা আসে নিজের তৈরি সেই মঞ্চ থেকেই, যেখান থেকে তাকে চরম অপমানজনকভাবে বিতাড়িত করা হয়। এরপর একে একে সরে যায় রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, এমনকি একসময়ের রক্ষকেরাই তার ওপর চড়াও হয় বলে জানা যায়। এই চরম বিপর্যয়ের মুখে ব্যক্তিগত জীবনেও নেমে আসে অন্ধকার; বিচ্ছেদ ঘটে স্ত্রীর সাথে।
দেশ ছেড়ে আত্মরক্ষার্থে সুদূর আমেরিকায় পাড়ি জমালেও সেখানে জোটে চরম লাঞ্ছনা। প্রবাসী বাংলাদেশিদের ক্ষোভের মুখে পড়ে কোনো প্রকার আতিথেয়তা তো দূরের কথা, বিমানবন্দরে চরম হেনস্থার শিকার হয়ে তাকে দেশে ফিরে আসতে হয়।
নির্বাচনী বৈতরণী ও ১ শতাংশের ট্র্যাজেডি
বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিজের হারিয়ে যাওয়া অস্তিত্ব প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন এই সাবেক ছাত্রনেতা। দলের মনোনয়ন পাওয়ার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও মমতাজ বা মাশরাফির মতো তারকারা যখন সবুজ সংকেত পান, তখন তাকে করা হয় চরম উপেক্ষা।
কোনো উপায় না দেখে শেষমেশ নিজের এলাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। কিন্তু নিয়তির চূড়ান্ত পরিহাস এখানেই—যে মানুষটির পেছনে একসময় লাখো জনতার স্লোগান মুখরিত হতো, তিনি নিজের এলাকায় সাধারণ ভোটারদের ন্যূনতম ১ শতাংশ সমর্থনের আইনি ডকুমেন্ট বা স্বাক্ষর জোগাড় করতে ব্যর্থ হন। ফলে নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তার মনোনয়নপত্রটি সরাসরি বাজেয়াপ্ত বা বাতিল ঘোষণা করা হয়।
বেঁচে থাকুক ‘ইতিহাসের দলিল’ হয়ে
আজকের দিনে তার এই শোচনীয় দশা কেবল একজন ব্যক্তির পতন নয়, বরং এটি ইতিহাসের এক জ্বলন্ত শিক্ষা। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে যারা জনগণের আবেগ নিয়ে খেলা করে এবং ছদ্মবেশী ‘মুনাফিক’ বা মীর জাফরের ভূমিকা নেয়, তাদের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে—তিনি তারই জীবন্ত প্রমাণ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে এখন একটাই আওয়াজ: এই পতনের পর অন্তত তিনি যেন কোনো চরম পথ বেছে না নেন। বরং তিনি বেঁচে থাকুন হাজার বছর, ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল হয়ে। যুগের পর যুগ ধরে মানুষ তাকে দেখুক এবং শিক্ষা নিক—সুবিধাবাদী ও বিশ্বাসঘাতকদের শেষ পরিণতি কতটা করুণ ও অপমানজনক হয়।
-
সোহেল হাওলাদার ,নির্বাহী সম্পাদক, দৈনিক পূর্বাচল।
-

