মেডিকেল ডেস্ক, দৈনিক পূর্বাচল:
বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে বাঁচতে প্রথম ২৪ ঘণ্টার সঠিক সিদ্ধান্তই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ডেঙ্গুর লক্ষণ, বিপজ্জনক উপসর্গ এবং ইউনিসেফ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী করণীয় জানতে পড়ুন দৈনিক পূর্বাচলের এই বিশেষ প্রতিবেদন।
বর্ষাকাল এলেই বাংলাদেশে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ। জ্বর, শরীরব্যথা বা মাথাব্যথার মতো সাধারণ উপসর্গ দিয়ে শুরু হওয়া এই রোগটি কখন যে গুরুতর রূপ নেয়, তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা কঠিন। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর ক্ষেত্রে প্রথম ২৪ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সঠিক পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF)-এর গাইডলাইন অনুযায়ী, ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই রোগটি মোকাবিলার মূল কৌশল হলো—দ্রুত লক্ষণ শনাক্ত করা, শরীরে পর্যাপ্ত তরল বজায় রাখা এবং বিপজ্জনক উপসর্গ দেখা দিলে রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া।
প্রাথমিক লক্ষণগুলো চিনে রাখুন
ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বরের মতোই মনে হতে পারে। তবে নিচের উপসর্গগুলো দেখা দিলে অবিলম্বে সতর্ক হতে হবে:
-
হঠাৎ ১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত তীব্র জ্বর।
-
তীব্র মাথাব্যথা এবং চোখের পেছনে ব্যথা।
-
শরীর, পেশি ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা (যাকে হাড়ভাঙা জ্বরও বলা হয়)।
-
অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমিভাব বা বমি এবং ক্ষুধামন্দা।
-
ত্বকে লালচে র্যাশ বা দাগ দেখা দেওয়া।
প্রথম ২৪ ঘণ্টার করণীয়
১. চিকিৎসকের পরামর্শ: জ্বর শুরু হওয়ার পর নিজে থেকে কোনো অনুমান না করে দ্রুত একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রেসক্রিপশন বা ফার্মেসি থেকে নিজে ওষুধ কিনে খাওয়া বিপদের কারণ হতে পারে। ২. পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ: ডেঙ্গুতে শরীর থেকে দ্রুত তরল উপাদান কমে যায়। তাই শুরু থেকেই বিশুদ্ধ পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, স্যুপ ও পাতলা ভাতের মাড় অল্প অল্প করে বারবার পান করতে হবে। ৩. পর্যাপ্ত বিশ্রাম: এই সময়ে যেকোনো ধরনের শারীরিক পরিশ্রম বা বাইরে ঘোরাঘুরি বন্ধ করে সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকতে হবে। পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। ৪. জ্বর কমাতে সঠিক ওষুধ: ডেঙ্গু জ্বরে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণত শুধু প্যারাসিটামল সেবন করা নিরাপদ। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, ন্যাপ্রোক্সেন বা অ্যাসপিরিনজাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া সম্পূর্ণ নিষেধ; কারণ এগুলো শরীরের অভ্যন্তরে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। ৫. প্লাটিলেট নিয়ে অযথা আতঙ্ক নয়: ডেঙ্গু হলেই প্লাটিলেট কত—তা নিয়ে অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। চিকিৎসকেরা কেবল প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেন না। রোগীর রক্তচাপ, নাড়ির গতি, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং রক্তক্ষরণের লক্ষণের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
কখন দ্রুত হাসপাতালে নেবেন? (বিপজ্জনক লক্ষণ)
রোগীর মধ্যে নিচের যেকোনো একটি লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি না করে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে:
-
তীব্র পেটব্যথা এবং অনবরত বমি হওয়া।
-
নাক, মাড়ি বা ত্বকের নিচে রক্তক্ষরণ অথবা কালো পায়খানা হওয়া।
-
শ্বাসকষ্ট হওয়া কিংবা হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া।
-
চরম দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুম-ঘুম ভাব বা অচেতন হওয়ার প্রবণতা।
-
প্রস্রাবের পরিমাণ কমে যাওয়া।
কী করবেন না?
-
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা ব্যথানাশক ওষুধ খাবেন না।
-
পেঁপে পাতার রস বা কোনো ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে মূল চিকিৎসা বিলম্বিত করবেন না।
-
আক্রান্ত রোগীকে অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখুন, যেন তাকে কামড়ানো এডিস মশা অন্য কোনো সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে না পারে।
তথ্যসূত্র: ইউনিসেফ (UNICEF) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)।

