জিয়া হত্যার খুনি মেজর মোজাফফর গ্রেফতার: ২৮ বছর দেশেই আত্মগোপনের চাঞ্চল্যকর তথ্য

ডেস্ক রিপোর্ট: সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সাজাপ্রাপ্ত ও পলাতক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। দীর্ঘ ২৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে তিনি দেশেই অবস্থান করছিলেন। পুলিশের খাতায় ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ এবং মাথায় মৃত্যুপরোয়ানা নিয়ে ঘুরে বেড়ানো এই ধুরন্ধর সাবেক সেনা কর্মকর্তা অবশেষে বুধবার রাতে ডিবির জালে ধরা পড়েন। গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার নানা অবিশ্বাস্য কৌশলের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। বর্তমানে তিনি সেনা হেফাজতে রয়েছেন।

কলকাতায় ১৭ বছর ও জাল পাসপোর্টের রহস্য ডিবি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা যায়, ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পরদিনই সীমান্ত পার হয়ে ভারতে পালিয়ে যান মোজাফফর। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ঘোরাঘুরি করে একপর্যায়ে কলকাতায় অবস্থান নেন তিনি। সেখানে ভুয়া নাম-পরিচয় ব্যবহার করে ভারতের নাগরিকত্ব নেন এবং নিয়মিত নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকেন। পরবর্তীতে সেই জাল নথির সাহায্যে ভারতীয় পাসপোর্ট তৈরি করে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা (ইন্টারপোল) ও বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেন, যাতে কেউ তাঁর অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারে।

২৮ বছর ধরে বাংলাদেশে আত্মগোপন কলকাতায় ১৭ বছর পলাতক জীবন কাটানোর পর, ১৯৯৮ সালে গোপনে বাংলাদেশে ফিরে আসেন মোজাফফর। এরপর থেকে দীর্ঘ ২৮ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি দেশের বিভিন্ন জেলায় ভাড়া বাসায় ছদ্মনামে বসবাস করছিলেন। জীবনের শেষ দিনগুলো পরিবারের সঙ্গে কাটানোর উদ্দেশ্যে গত কয়েক বছর ধরে তিনি ঢাকার একটি ডিওএইচএস এলাকায় শ্বশুরের ফ্ল্যাটে স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে থাকছিলেন। নিজের আসল নাম-পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখায় ডিওএইচএস-এর মতো সুরক্ষিত এলাকায় থেকেও কেউ টেরই পায়নি যে তিনি জিয়া হত্যার ফাঁসির আসামি।

ইতিহাসের খেরোখাতা ও জিয়া হত্যাকাণ্ডে মোজাফফরের ভূমিকা মেজর মোজাফফরের গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে সাড়ে চার দশকের পুরোনো অনেক অমীমাংসিত অধ্যায়ের জট খুলবে বলে আশা করা হচ্ছে। প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ‘বাংলাদেশ: অ্যা লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ের বিবরণ অনুযায়ী, জিয়া হত্যাকাণ্ডের মুহূর্তে শুধু উপস্থিত থাকাই নয়, বরং ঘটনার এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাদের নিয়ে সার্কিট হাউজে যান। তাঁরা জিয়ার শোয়ার ঘর তল্লাশি করে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র একটি পুরোনো স্যুটকেসে ভরেন এবং জিয়াসহ নিহত দুই নিরাপত্তা কর্মকর্তার লাশ কাপড়ে মুড়িয়ে সামরিক যানে করে নিয়ে যান।

পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল এমএ মঞ্জুরের দপ্তরে ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর পালিয়ে যাওয়ার পথে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে অন্য সেনা কর্মকর্তারা নিহত ও গ্রেফতার হলেও মোজাফফর কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।

দীর্ঘ সাড়ে চার দশক ধরে রহস্যে ঘেরা এই আত্মগোপন ও ঐতিহাসিক জিয়া হত্যাকাণ্ডের অন্যতম প্রধান কুশীলবের গ্রেফতারের ঘটনাটি এখন দেশজুড়ে টক অব দ্য টাউনে পরিণত হয়েছে।

[নিউজ ক্যাটাগরি: আইন ও অপরাধ / জাতীয় / বিশেষ সংবাদ]

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment

Prove your humanity: 8   +   10   =