সোহেল হাওলাদার:
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করলেও ক্ষমতার কোনো চাকচিক্য বা অহংকার স্পর্শ করেনি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে। পড়ুন তাঁর জীবন ও দর্শনের বিশেষ প্রতিবেদন।
রাজনীতিতে ক্ষমতা মানুষকে বদলে দেয়— প্রচলিত এই ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর এক অনন্য চরিত্রের নাম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী, পূর্ণমন্ত্রী এবং এক দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে তিনি ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতা এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। অথচ এই সুদীর্ঘ পথচলা শেষেও তাঁর ব্যক্তিজীবনে ক্ষমতার কোনো চাকচিক্য, সম্পদের প্রদর্শন কিংবা প্রভাবের অহংকার চোখে পড়ে না।
সাদামাটা জীবন ও মাটির টান এক বনেদি রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নেওয়া মির্জা ফখরুল চাইলে বিলাসিতাপূর্ণ জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি সচেতনভাবেই বেছে নিয়েছেন সাদামাটা জীবন ও মানুষের পাশে থাকার পথ। ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ির সাদা রঙের ছিমছাম বাড়িটি যেন তাঁর ব্যক্তিত্বেরই প্রতিচ্ছবি। তিনি এলাকায় এলেই ভোর থেকে শুরু হয় সাধারণ মানুষের আনাগোনা। দিনমজুর থেকে শুরু করে শিক্ষক, কৃষক, রাজনৈতিক কর্মী— সবার কথাই তিনি ধৈর্য নিয়ে শোনেন। রাস্তার পাশের টং দোকানে বসে চা খাওয়া কিংবা পুরোনো পরিচিতদের খোঁজে গাড়ি থামিয়ে কুশল বিনিময় করা তাঁর চেনা রূপ।
আদর্শ ও রাজনৈতিক দর্শন বাম রাজনীতি দিয়ে জীবন শুরু করা মির্জা ফখরুল পরে জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যোগ দিলেও মানুষের জন্য কাজ করার বিশ্বাস থেকে সরেননি। তাঁর ভাষায়, “এটাই আমার লাইফস্টাইল। মানুষের জন্য রাজনীতিটা করার চেষ্টা করি। দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছিলাম, সেটা হয়নি। এখন নিজেরা যতটুকু পারি সহজ-সরল থাকার চেষ্টা করি।” রাজনীতি করতে গিয়ে ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিক্রির বিরল উদাহরণও রয়েছে তাঁর।
রাজপথের অবিচল অধিনায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে শিক্ষকতা শুরু করলেও রাজপথের টান তাঁকে রাজনীতিতে নিয়ে আসে। ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে বিএনপি যখন সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় পার করছিল, তখন চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতিতে দলকে টিকিয়ে রাখার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা হয়েছে, ১১ বার কারাগারে গিয়ে প্রায় সাড়ে তিন বছর বন্দি জীবন কাটিয়েছেন; কিন্তু হতাশ হননি। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের লড়াইয়ে সম্মুখসারির নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।
পরিবার ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ে পরিবারকে পর্যাপ্ত সময় দিতে না পারলেও সহধর্মিণী রাহাত আরা বেগমের নিরবচ্ছিন্ন সমর্থনই ছিল তাঁর মূল শক্তি। সম্পত্তি বা বিত্ত-বৈভবের প্রতি এই দম্পতির কোনো দিন কোনো আগ্রহ ছিল না। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ রেখে যেতে চান এই প্রবীণ রাজনীতিক।
উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিবেশেও সংযত ভাষা ও ক্লিন ইমেজের কারণে সমর্থক কিংবা সমালোচক— সবার কাছেই মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক পরম শ্রদ্ধেয় ও যৌক্তিক রাজনীতিকের নাম

