ইসলাম ও জীবন | ডেইলি পূর্বাচল
ডেস্ক রিপোর্ট:
ডেস্ক রিপোর্ট:
ঘুম থেকে জেগে ওঠা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমাতে যাওয়া পর্যন্ত, মানুষের জীবনের সিংহভাগ ব্যস্ততাই আবর্তিত হয় ‘রিজিক’ বা জীবিকাকে কেন্দ্র করে। এই রিজিক অন্বেষণে মানুষ প্রতিনিয়ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছে। তবে একজন মুমিন হিসেবে আমাদের মনে রাখা জরুরি যে, আমরা যতই শ্রম দিই না কেন, রিজিকের মূল চাবিকাঠি ও এর প্রকৃত মালিক একমাত্র মহান আল্লাহ তাআলা।
বিশ্বজগতের প্রতিটি সৃষ্টির জীবিকার নিখুঁত ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা আল্লাহ নিজেই করে রেখেছেন। পবিত্র কোরআনে রাব্বুল আলামিন অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় এই গ্যারান্টি দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে—
وَمَا مِنْ دَآبَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللّٰهِ رِزْقُهَا
“পৃথিবীতে বিচরণশীল এমন কোনো প্রাণী নেই, যার রিজিকের দায়িত্ব আল্লাহর ওপর নেই।” (সূরা হুদ, আয়াত: ৬)
একবার গভীর বৈজ্ঞানিক ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে চিন্তা করলে দেখা যায়, মাটির গভীর অন্ধকারের ক্ষুদ্রতম পোকা থেকে শুরু করে আদিগন্ত সমুদ্রের বিশাল তিমি—কারো আহারের জোগান দিতে আল্লাহ ভুল করেন না। সবার রিজিকই পূর্বনির্ধারিত।
হাদিসের অমোঘ ঘোষণা: দুশ্চিন্তার অবকাশ নেই
অনেকেই রিজিক বা উপার্জনের গতি কিছুটা কমে গেলে চরম হতাশায় নিমজ্জিত হন। এই মানসিক অস্থিরতা দূর করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মাহকে এক চিরন্তন অভয়বাণী দিয়েছেন।
হজরত জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত এক সহিহ হাদিসে আল্লাহর রাসুল (সা.) ইরশাদ করেন:
“তোমরা তোমাদের রিজিক আসতে দেরি হচ্ছে বলে মনে করো না (কিংবা হতাশ হয়ো না)। কারণ, কোনো বান্দাই তার জন্য নির্ধারিত সর্বশেষ রিজিকটুকু পুরোপুরি পাওয়ার আগে কখনোই মৃত্যুবরণ করবে না। অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং উত্তম পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করো—যা হালাল তা গ্রহণ করো এবং যা হারাম তা বর্জন করো।” (সুনান ইবনু মাজাহ, হাদিস: ২১৪৪)
এই হাদিস প্রমাণ করে যে, মানুষের আয়ু যেমন নির্ধারিত, তার রিজিকও ঠিক তেমনি সুনির্দিষ্ট। মৃত্যুর আগে নিজের প্রাপ্য অংশটুকু মানুষ পাবেই।
কর্মবিমুখতা নয়, প্রয়োজন ‘তাওয়াক্কুল’
ইসলামের এই রিজিক-দর্শনের ভুল ব্যাখ্যা করে ঘরে বসে থাকার কোনো সুযোগ নেই। আল্লাহ রিজিকের দায়িত্ব নিয়েছেন মানে এই নয় যে, বান্দা হাত গুটিয়ে বসে থাকবে। বরং ইসলাম আমাদের শেখায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করার পর ফলের জন্য আল্লাহর ওপর ভরসা বা তাওয়াক্কুল করা।
রিজিক অন্বেষণের এই ভারসাম্যপূর্ণ রূপটি বোঝাতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) পাখিদের চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন। হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন:
“তোমরা যদি আল্লাহর প্রতি যথাযোগ্য ভরসা (তাওয়াক্কুল) রাখতে পারো, তবে তিনি তোমাদেরকে ঠিক সেইভাবে রিজিক দান করবেন, যেভাবে পাখিদের দান করে থাকেন। তারা সকালে ক্ষুধার্ত পেটে (বাসা থেকে) বের হয় এবং সন্ধ্যায় উদর পূর্ণ করে (বাসায়) ফিরে।” (জামি` আত-তিরমিযি, হাদিস: ২৩৪৪)
এখানে লক্ষ্যণীয় যে, পাখিরা কিন্তু বাসায় বসে থাকে না, তারা খাদ্যের সন্ধানে ডানা মেলে বাইরে বের হয়। অর্থাৎ, মুমিনের কাজ হলো হালাল উপায়ের জন্য শতভাগ চেষ্টা করা, আর ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর সমর্পণ করা।
রিজিকের বিশাল পরিধি
আমাদের প্রাত্যহিক সমাজে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে যে, কেবল টাকা-পয়সা, গাড়ি-বাড়ি বা ব্যাংক ব্যালেন্সই বোধহয় রিজিক। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে রিজিকের সংজ্ঞা অত্যন্ত ব্যাপক। মানুষের শারীরিক সুস্বাস্থ্য, মানসিক প্রশান্তি, নেককার ও বাধ্যগত সন্তান, বিপদমুক্ত নিরাপদ জীবন এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—ঈমানি শক্তি ও সৎ কাজের তাওফিক পাওয়াও একেকটি অমূল্য ও শ্রেষ্ঠ রিজিক।
দৈনন্দিন জীবনে করণীয়
দৈনিক কর্মব্যস্ততার মাঝেও রিজিকের বরকত ধরে রাখতে ইসলামের কিছু নির্দেশনা রয়েছে:
- গুনাহ বর্জন করা: রাসুল (সা.) জানিয়েছেন, অনেক সময় মানুষ তার কৃত গুনাহের কারণে নির্ধারিত রিজিক থেকে বঞ্চিত হয় (ইবনে মাজাহ: ৪০২২)।
- তাকওয়া ও ইস্তিগফার: আল্লাহকে ভয় করে চললে এবং বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ অকল্পনীয় উৎস থেকে রিজিকের দুয়ার খুলে দেন।
- সততা বজায় রাখা: ব্যবসা বা কর্মক্ষেত্রে মিথ্যা ও প্রতারণা বর্জন করলে উপার্জনে বরকত বৃদ্ধি পায়।
উপসংহার:
বর্তমান এই তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে ক্যারিয়ার বা জীবিকা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে নিজের মানসিক শান্তি ও ইবাদতের সময় নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ‘ডেইলি পূর্বাচল’-এর পাঠকদের প্রতি আহ্বান—আসুন, আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা বজায় রাখি এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস রাখি যে, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি কখনোই আমাদের অসহায় ছেড়ে দেবেন না।
বর্তমান এই তীব্র প্রতিযোগিতার যুগে ক্যারিয়ার বা জীবিকা নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করে নিজের মানসিক শান্তি ও ইবাদতের সময় নষ্ট করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। ‘ডেইলি পূর্বাচল’-এর পাঠকদের প্রতি আহ্বান—আসুন, আমরা আমাদের কর্মক্ষেত্রে সর্বোচ্চ সততা ও নিষ্ঠার সাথে চেষ্টা বজায় রাখি এবং মনেপ্রাণে বিশ্বাস রাখি যে, যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, তিনি কখনোই আমাদের অসহায় ছেড়ে দেবেন না।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল ও বরকতময় রিজিক দান করুন। আমিন।


