অন্যান্য

লাইভ লোকেশনেই শেষ আকুতি: কুমিল্লার তাজমিন হত্যার চাঞ্চল্যকর উন্মোচন/দৈনিক পূর্বাচল

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক পূর্বাচল:

কুমিল্লায় অটোরিকশায় তুলে সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী তাজমিনকে নির্মম হত্যা। চট্টগ্রাম থেকে চালক গ্রেপ্তার, উদ্ধার আইফোন। বাবার মোবাইলে লাইভ লোকেশন পাঠিয়েও বাঁচেনি প্রাণ।

কক্সবাজার থেকে বাসে করে এসে নামার পর নিজ বাসায় ফেরার কথা ছিল সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৩)। গভীর রাতে নির্জন পথ ধরে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় উঠেছিল সে। বিপদ বুঝতে পেরে শেষ আকুতি জানিয়ে বাবার হোয়াটসঅ্যাপে নিজের লাইভ লোকেশন এবং ‘আমাকে এসে নিয়ে যাও’ বার্তা পাঠিয়েছিল কিশোরীটি। কিন্তু গভীর রাতে বাবা ঘুমিয়ে থাকায় সেই বার্তা পৌঁছাতে পৌঁছাতে অনেক দেরি হয়ে যায়। পরদিন সকালে লালমাইয়ের এক নির্জন ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হয় তার নিথর মরদেহ।

চাঞ্চল্যকর ও নির্মম এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জড়িত সিএনজি অটোরিকশাচালক সুমনকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। উদ্ধার করা হয়েছে তাজমিনের ব্যবহৃত দামি আইফোনটি।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার বাসিন্দা ও রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে কর্মরত কর্মকর্তা আবদুল আলীমের একমাত্র মেয়ে। পরিবারের সঙ্গে তারা কুমিল্লা নগরীর রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থাকত। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।

পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে কক্সবাজার যায় তাজমিন। গত বুধবার (৭ অক্টোবর) সেখান থেকে বাসে করে রওনা দিয়ে রাত সাড়ে ১০টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারের নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে সে। রাত ১২টা ১৯ মিনিটে নূরজাহান হোটেলের সামনে থেকে রেসকোর্সের বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে একটি অটোরিকশায় ওঠে কিশোরীটি।

নির্জন পথে ধস্তাধস্তি ও মোবাইল লাইভ লোকেশন

নিরাপদে বাড়ি পৌঁছানোর পরিবর্তে চালক সুমন অটোরিকশাটি শহরের দিকে না নিয়ে লালমাইয়ের দিকে ঘুরিয়ে নেয়। তাজমিন বিষয়টি বুঝতে পেরে রাত ২টা ৫৮ মিনিটে তার বাবার হোয়াটসঅ্যাপে লাইভ লোকেশন ও বাঁচানোর আকুতি জানিয়ে বার্তা পাঠায়।

অটোরিকশাটি বিজরা, রসুলপুর ও শিকারীপাড়া হয়ে জগতপুরের একটি নির্জন ধানক্ষেতের কাছে যায়। পুলিশের ধারণা, সেখানে প্রাণ বাঁচাতে তাজমিন পালানোর চেষ্টা করে। চার-পাঁচটি ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির আলামত পাওয়া গেছে। শেষ পর্যন্ত ঘাতকরা তার গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে।

সিসিটিভি ফুটেজ ও চালক গ্রেপ্তার

বৃহস্পতিবার সকালে জগতপুর গ্রামের ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের পাশেই পড়ে ছিল ঘাতক চালকের সিএনজি অটোরিকশাটি। অটোরিকশার সূত্র ধরে এর মালিকের সন্ধান পায় পুলিশ। মালিক জানান, গাড়িটি ভাড়ায় চালাতেন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা সুমন।

অভিযান চালিয়ে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরী থেকে চালক সুমনকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা ডিবি পুলিশ। প্রাথমিক অনুসন্ধানে চালক ছাড়া একাধিক ব্যক্তি এই হত্যাকাণ্ডে যুক্ত থাকার আলামত পেয়েছে পুলিশ।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আনিসুজ্জামান জানান, “মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও উদ্ধার হওয়া আইফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের মূল মোটিভ অনেকটাই স্পষ্ট হয়েছে। একাধিক ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া গেছে।”

স্বজনদের কান্না ও মায়ের ক্ষোভ

এদিকে মেয়ের মৃত্যুর খবরে যশোরের ছাতিয়ানতলা মল্লিকপাড়ার নিজ বাড়িতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ মা কেয়া খাতুন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমার মেয়ের বান্ধবীটি ভালো ছিল না। সে ভুলিয়ে-ভালিয়ে আমার মেয়েকে কক্সবাজারে নিয়ে গিয়েছিল। তাকে রক্ষা করতে অনেক চেষ্টা করেছি, এমনকি স্কুলে যাওয়াও বন্ধ রেখেছিলাম। কিন্তু শেষপর্যন্ত আমার কলিজার ধনকে হাহাকারের সাগরে ভাসিয়ে হায়েনার দল নির্মম নির্যাতন চালিয়ে মেরে ফেলল।”

নিহত তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। গ্রেপ্তারকৃত সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের ভিত্তিতে জড়িত অন্যদের আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment