নিজস্ব প্রতিবেদক: ডিজিটাল যুগে রানারের চিঠি কিংবা লাল ডাকবাক্সের ঐতিহ্য রূপকথার মতো মনে হলেও ডাক বিভাগের কার্যক্রম থেমে নেই। ই-কমার্স ও পার্সেল পরিবহনের এই বিশাল বাজারে সরকারি ডাক বিভাগ এখন অবস্থান শক্ত করতে মাঠে নেমেছে। কম খরচে সারা দেশে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার আইনি ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা থাকলেও এতদিন সময়ানুবর্তিতা ও বিপণন দক্ষতার অভাবে কিছুটা পিছিয়ে ছিল সরকারি এই প্রতিষ্ঠানটি। তবে প্রযুক্তিবান্ধব সেবা এবং নতুন উদ্যমে চালু হওয়া ‘স্পিড পোস্ট’ পাল্টে দিচ্ছে সেই চিত্র। বেসরকারি কুরিয়ারের তুলনায় ৩ থেকে ৬ গুণ কম খরচে সেবা দিয়ে বর্তমানে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে বাংলাদেশ ডাক বিভাগ।
সরকারি ডাক বনাম বেসরকারি কুরিয়ার: খরচের হিসাব
বাংলাদেশ ডাক অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের যেকোনো প্রান্তে প্রথম ১ কেজি পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ পার্সেলের ভিত্তি মাশুল মাত্র ১৫ টাকা। পরবর্তী প্রতি কেজির জন্য যুক্ত হয় ১০ টাকা। এর সঙ্গে পার্সেল রেজিস্ট্রি ফি ৩ টাকা এবং ইলেকট্রনিক চার্জ ১ টাকা যোগ হয়।
-
৫০০ গ্রাম থেকে ১ কেজি: খরচ মাত্র ১৯ টাকা।
-
৫ কেজি: ৫৯ টাকা।
-
১০ কেজি: ১০৯ টাকা।
-
২০ কেজি: ২০৯ টাকা।
-
৩০ কেজি: ৩০৯ টাকা।
অন্যদিকে, সুন্দরবন, এসএ পরিবহন বা আধুনিক ই-কমার্স কুরিয়ার সার্ভিসগুলোতে ৫০০ গ্রাম বা ১ কেজি পার্সেল পাঠাতে খরচ হয় ৬০ থেকে ১৩০ টাকা। ৫ থেকে ১০ কেজি পার্সেলের ক্ষেত্রে এই খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ১৮০ থেকে ৫৫০ টাকা পর্যন্ত। অর্থাৎ, সরকারি ডাকের তুলনায় বেসরকারি কুরিয়ারে খরচ ৩ থেকে ৬ গুণ বেশি। অতিরিক্ত পলি প্যাক, কার্টন প্যাকিং বা ক্যাশ অন ডেলিভারি (সিওডি) হ্যান্ডলিং ফি-এর কারণে এই ব্যবধান আরও বাড়ে।
পিছিয়ে পড়ার নেপথ্য কারণ ও চ্যালেঞ্জ
দেশজুড়ে ডাক বিভাগের প্রায় ৯ হাজার ৮৮৬টি শাখা ডাকঘর ও হাজার হাজার নিবন্ধিত কর্মী থাকলেও বেসরকারি কুরিয়ারের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় কিছু ক্ষেত্রে হোঁচট খেতে হয়। বেসরকারি কুরিয়ারগুলো হোম পিকআপ, ডোরস্টেপ ডেলিভারি, রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং সুবিধা এবং দ্রুত সেবা দিয়ে ক্রেতাদের মন জয় করছে। বিপরীতে, ডাক বিভাগে অনেক সময় গ্রাহককেই পোস্ট অফিসে গিয়ে পার্সেল জমা ও সংগ্রহ করতে হয়। এছাড়া পার্সেল পৌঁছাতে ৩ থেকে ১০ দিন সময় লাগা এবং ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির জটিলতা অতীতে গ্রাহকদের কিছুটা দূরে সরিয়ে রেখেছিল।
তবে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম আশাবাদ ব্যক্ত করে জানান, সম্প্রতি স্পিড পোস্ট সেবায় পার্সেল হারিয়ে যাওয়ার কোনো রেকর্ড নেই। ভুল প্যাকেজিংয়ের দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া বড় কোনো অভিযোগ নেই এবং আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণের পূর্ণ ব্যবস্থাও রয়েছে।
আশার আলো ‘স্পিড পোস্ট’ ও আন্তর্জাতিক পার্সেলের সাফল্য
চলতি বছরের মার্চ মাস থেকে পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হওয়া ‘স্পিড পোস্ট’ সেবা ডাক বিভাগের কার্যক্রমে নতুন গতি এনেছে। এর মাধ্যমে জেলা সদর থেকে ঢাকায় সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা এবং অন্যান্য দূরবর্তী জেলায় ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে পার্সেল পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
-
মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর: এই সময়ে স্পিড পোস্টের আওতায় ৮২৫ টন পার্সেল পরিবহন করা হয়েছে।
-
সেপ্টেম্বর মাসের প্রবৃদ্ধি: শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই পরিবহনের পরিমাণ ছিল ২২৫ টন। কমলাপুরসহ প্রধান কেন্দ্রগুলো থেকে ঢাকা, রাজশাহী বা খুলনার কাভার্ড ভ্যানের চাহিদা মেটাতে এখন বিকল্প ট্রিপ চালু করতে হচ্ছে।
-
আর্থিক সাফল্য: নতুন এই সেবা চালুর পর থেকে মাত্র কয়েক মাসে পোস্ট অফিসের আয় হয়েছে ৬০ লাখ টাকা।
-
আন্তর্জাতিক বাজারে সাফল্য: দেশীয় বাজারের পাশাপাশি বিদেশে পার্সেল পাঠানোর ক্ষেত্রেও এসেছে বড় সাফল্য। ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে আন্তর্জাতিক পার্সেলের পরিমাণ ছিল ২৪৩ টন, যা ২০২৬ সালের একই সময়ে ২৯.৮৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৩১৬ টনে।
কম খরচে নিরাপদ ও দ্রুতগতির পার্সেল সেবার এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে সরকারি ডাক বিভাগ ই-কমার্স ও লজিস্টিকস খাতের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।


