নিজস্ব প্রতিবেদক:
আগামী চার বছরে বাংলাদেশকে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। ঋণ পরিশোধের এই ক্রমবর্ধমান চাপ ও সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন।
বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে অতীতে কোনো খেলাপির রেকর্ড না থাকলেও আগামী দিনগুলোতে বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধের চাপ তৈরি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আগামী চার বছরে দেশের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ বাবদ মোট ২৩ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার বা প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। অর্থাৎ প্রতি বছর গড়ে ৫ দশমিক ৮১ বিলিয়ন ডলার (৭২ হাজার কোটি টাকা) পরিশোধ করতে হবে সরকারকে।
অর্থনীতিবিদদের শঙ্কা, ঋণ পরিশোধের এই পরিমাণ ২০৩০ সালে গিয়ে ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়াবে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বছরওয়ারি ঋণ পরিশোধের চিত্র ও সরকারের প্রস্তুতি
অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৭ সালে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে। প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, ওই বছর ঋণ পরিশোধে প্রয়োজন হবে ৫ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালে গিয়ে দাঁড়াবে ৬ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের পরিবর্তনের ওপর নির্ভর করে এই অঙ্কে তারতম্য হতে পারে।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি সংবাদমাধ্যমকে জানান, বৈদেশিক ঋণের চাপ যে বাড়ছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এটি মোকাবিলায় সরকার কাজ করে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “ঋণ পরিশোধে যাতে কোনো সমস্যা না হয়, সেজন্য ডলারের জোগান বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বিদেশে ডলার পাচার রোধ, রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি এবং রপ্তানি বহুমুখীকরণের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ফলে বড় কোনো সংকট তৈরি হবে না।”
এদিকে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বৈঠকে তিনি বলেন, পরিচালন বাজেটের বড় একটি অংশ এখন ঋণ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে। তাই প্রকল্প ব্যয় বৃদ্ধি এবং ঋণ পরিশোধের হারের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ থাকা প্রয়োজন।
অর্থছাড় কমেছে, তবে চিন্তার কারণ নেই: পরিকল্পনা সচিব
ইআরডির সর্বশেষ তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে ৬৯ কোটি ৮৯ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬৬ কোটি ৭১ লাখ ডলার। অর্থাৎ বছরের শুরুতেই ঋণ পরিশোধের পরিমাণ কিছুটা বেড়েছে। তবে এর বিপরীতে উদ্বেগজনক হারে কমেছে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড়। চলতি অর্থবছরের দুই মাসে বৈদেশিক ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ২৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৭৫ কোটি ডলার।
এ বিষয়ে পরিকল্পনা সচিব এস এম শাকিল আকতার বলেন, “অতীতে আমরা কোনো ঋণের কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হইনি, আশা করি আগামীতেও কোনো সমস্যা হবে না। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বৈদেশিক ঋণঝুঁকির সীমার নিচেই রয়েছে বাংলাদেশ। আমরা এখনও ‘রেড জোনে’ যাইনি। তবে যে প্রকল্পগুলোতে ঋণ নেওয়া হচ্ছে, সেখান থেকে যেন কাঙ্ক্ষিত সুফল বা আউটকাম আসে, সে বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশন অত্যন্ত সচেতন রয়েছে।”
চলতি অর্থবছরের এডিপি ও আইএমএফের সতর্কবার্তা
চলতি অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ১৫ খাতের ২৪৫টি প্রকল্পের অনুকূলে বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে মোট ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এর মধ্যে পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে সর্বোচ্চ ২৭ হাজার ৬৫৪ কোটি টাকা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ২৫ হাজার ৯৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তবে বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর অদক্ষতা, প্রকল্প পরিচালকদের দক্ষতার অভাব এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের অর্থ খরচ কমে মাত্র ১ দশমিক ২২ শতাংশে নেমেছে।
উল্লেখ্য, রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ের তুলনায় বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ বেড়ে যাওয়ায় আইএমএফ ইতোমধ্যেই বাংলাদেশকে সতর্ক করেছে এবং ঋণ স্থায়িত্ব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে বাংলাদেশকে মধ্যমঝুঁকির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।


