নিজস্ব প্রতিবেদক, স্বাস্থ্য ডেস্ক:
মাথার নিচ থেকে কাঁধের ওপর পর্যন্ত ঘাড়ের যেকোনো অংশে অস্বস্তি, মাংসপেশি শক্ত হয়ে যাওয়া কিংবা তীব্র ব্যথা হলে তাকে সাধারণ অর্থে ঘাড়ব্যথা বলা হয়। এই ব্যথা অনেক সময় শুধু ঘাড়েই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং কাঁধ হয়ে হাত পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক সময় ব্যথার পরিবর্তে হাত বা আঙুলে ঝিনঝিন করা, জ্বালাপোড়া কিংবা অবশ ভাব অনুভূত হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ ধরনের অবস্থাকে ‘সারভাইক্যাল রেডিকুলোপ্যাথি’ বলা হয়।
উচ্চ রক্তচাপ বা হার্টের সমস্যা কি ঘাড়ব্যথার কারণ?
অনেকেই ঘাড় ও কাঁধে ব্যথা অনুভব করলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন এবং এটিকে উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগের লক্ষণ বলে মনে করেন। চিকিৎসকদের মতে, সাধারণত ঘাড়ব্যথা উচ্চ রক্তচাপের সরাসরি কোনো লক্ষণ নয়। তবে অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা উদ্বেগের কারণে রক্তচাপ বাড়লে কিংবা পেশিতে অতিরিক্ত টান তৈরি হলে ঘাড়ে অস্বস্তি বা ব্যথা হতে পারে।
ঘাড়ব্যথার প্রধান কারণসমূহ
দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নানা অভ্যাসের কারণে ঘাড়ে ব্যথা হতে পারে। এর মূল কারণগুলো হলো:
-
পেশিতে টান: ভুল ভঙ্গিতে ঘুমানো, অতিরিক্ত পরিশ্রম করা কিংবা হঠাৎ করে ঘাড়ে জার্ক বা অতিরিক্ত ঝাঁকুনি লাগার কারণে পেশিতে টান পড়তে পারে।
-
ডিজিটাল ডিভাইসের অতিরিক্ত ব্যবহার: দীর্ঘ সময় ধরে মাথা নিচু করে মোবাইল, ল্যাপটপ বা কম্পিউটার ব্যবহার করলে ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে।
-
সারভাইক্যাল স্পন্ডালাইটিস: বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়ের হাড় বা স্পাইনাড ডিস্ক ক্ষয় হয়ে এই রোগ দেখা দিতে পারে।
-
স্নায়ুতে চাপ: ঘাড়ের কোনো স্নায়ু বা নার্ভে অতিরিক্ত চাপ পড়লে সেই ব্যথা হাত বা আঙুল পর্যন্ত ছড়িয়ে যেতে পারে।
-
মানসিক চাপ: অতিরিক্ত মানসিক টেনশনের কারণেও ঘাড়ের পেশিগুলো শক্ত হয়ে ব্যথা সৃষ্টি করতে পারে।
কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন এবং সতর্ক হবেন?
সব ঘাড়ব্যথা সাধারণ নয়। কিছু উপসর্গ দেখা দিলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। যেমন:
-
ঘাড়ে অসহ্য ও তীব্র ব্যথা এবং ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া।
-
মাথাব্যথা কিংবা হাত ও আঙুলে অবশ ভাব বা সুচ ফোটার মতো অনুভূতি হওয়া।
-
হাতে বা বাহুতে অস্বাভাবিক দুর্বলতা অনুভূত হলে।
এ ধরনের সমস্যায় মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, অর্থোপেডিক সার্জন, নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞ, নিউরোসার্জন, ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও চিকিৎসা প্রদান করে থাকেন।
ঘাড়ব্যথার চিকিৎসা ও প্রতিকার
প্রাথমিক পর্যায়ে অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম ও ভারী কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রয়োজনে ঘরোয়া উপায়ে ঘাড়ে গরম বা ঠান্ডা সেঁক নিতে পারেন। ব্যথা বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অল্প সময়ের জন্য ‘সারভাইক্যাল কলার’ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ফিজিওথেরাপিস্টের পরামর্শ নিয়ে নিচে উল্লেখিত থেরাপিগুলো নেওয়া যেতে পারে:
-
ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানুয়াল ট্রাকশন ও সারভাইক্যাল ট্রাকশন।
-
ইলেকট্রোথেরাপি, থেরাপিউটিক আলট্রাসাউন্ড ও লেজার থেরাপি।
-
ড্রাই নিডিলিং বা শক ওয়েভ থেরাপি।
রোগীর শারীরিক অবস্থা বুঝে চিকিৎসকরা ব্যথানাশক ওষুধ, মাংসপেশি শিথিলকারী (Muscle Relaxant) এবং নিউরো ভিটামিন প্রেসক্রাইব করে থাকেন। এছাড়া ফিজিওথেরাপিস্টের তত্ত্বাবধানে আইসোমেট্রিক নেক মাসল স্ট্রেন্থেনিং এক্সারসাইজ ও মোবিলাইজিং ব্যায়াম করা যেতে পারে।
কখন সার্জারির প্রয়োজন হয়?
চিকিৎসকদের মতে, প্রায় ৯৫ থেকে ৯৮ শতাংশ ঘাড়ব্যথার রোগী সঠিক ওষুধ সেবন, নিয়মিত ফিজিওথেরাপি এবং উপযুক্ত ব্যায়ামের মাধ্যমেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে ছয় থেকে আট সপ্তাহ ওষুধ ও থেরাপি নেওয়ার পরও যদি ব্যথা না কমে, হাতের শক্তি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে, অসারতা দেখা দেয় কিংবা স্পাইনাল ক্যানেলে গুরুতর চাপ সৃষ্টি হয়, কেবল তখনই সার্জারি বা অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতে পারে।
ঘাড়ব্যথা এড়াতে করণীয়
দৈনন্দিন জীবনে কিছু ছোট সতর্কতা মেনে চললে ঘাড়ব্যথার ঝুঁকি অনেকাংশেই কমানো সম্ভব:
-
মোবাইল বা ট্যাব ব্যবহারের সময় মাথা নিচু না করে ডিভাইসটি চোখের সমান উচ্চতায় ধরুন।
-
ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের মনিটর চোখের সমান্তরালে রাখুন।
-
ঘুমানোর সময় খুব উঁচু বালিশ ব্যবহার না করে নরম ও নিচু বালিশ ব্যবহার করুন। কাত হয়ে ঘুমালে মাথা ও ঘাড়ের সঠিক অবস্থান নিশ্চিত করুন এবং প্রয়োজনে ‘সারভাইক্যাল বালিশ’ ব্যবহার করতে পারেন।
-
মাথায় অতিরিক্ত ভার বহন করা থেকে বিরত থাকুন। কোনো ভারী জিনিস তোলার সময় এক হাতে না তুলে দুই হাতে সমানভাবে ভাগ করে তুলুন।
-
দীর্ঘ সময় কম্পিউটারে কাজ করার ফাঁকে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন। লম্বা সফর বা দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানোর সময় ঘাড়ের পেছনে ছোট কুশন ব্যবহার করুন।
দৈনিক পূর্বাচল-এর স্বাস্থ্য বিভাগ


