অর্থনীতি

থাই পাঙাশের পথপ্রদর্শক বিজ্ঞানী খলিলুর রহমান ও দেশের আমিশ উৎপাদনে বিপ্লব

নিজস্ব প্রতিবেদক:

স্বাধীনতার পর দেশের মানুষের আমিষের প্রধান উৎস ছিল উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছ , খলিলুর রহমান বলছিলেন, স্বাধীনতার পর দেশে মানুষের আমিষের প্রধান উৎস ছিল উন্মুক্ত জলাশয়ের মাছ]। ১৯৭১ সালে ৭ কোটি মানুষের বিপরীতে মাছের উৎপাদন ছিল মাত্র পাঁচ লাখ টন , ৭১ সালে দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে ৭ কোটি। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তখন মাছের উৎপাদন ছিল প্রায় পাঁচ লাখ টন]। সেখান থেকে মৎস্যবিজ্ঞানীদের নিরলস গবেষণার ফলে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশের মাছের উৎপাদন ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টনে উন্নীত হয়েছে [cite: মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৩-‌وার অর্থবছরে দেশে মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৫০ দশমিক ১৮ লাখ টনে]। এই বিপ্লবের পেছনের অন্যতম কারিগর বিজ্ঞানী ড. মোহাম্মদ খলিলুর রহমান, যিনি ১৯৯৩ সালে দেশে প্রথমবারের মতো থাই পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননে ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেন, সেই তরুণ আর কেউ নন, বিজ্ঞানী মোহাম্মদ খলিলুর রহমান। ওই বছরই দেশে প্রথমবারের মতো থাই পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননে সফল হন তিনি।

নদী থেকে গবেষণাগারে কঠিন সংগ্রাম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিশারিজ টেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর শেষ করে ১৯৮৭ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) চাঁদপুর নদীকেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন খলিলুর রহমান , নদী থেকে গবেষণাগারে: বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিশারিজ টেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর শেষে ১৯৮৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) চাঁদপুর নদীকেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন খলিলুর রহমান]। নদীর পাঙাশকে পুকুরে বাঁচানো এবং কৃত্রিম উপায়ে ডিম ছাড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি নিজেই স্পিডবোট চালিয়ে হিজলা পর্যন্ত নদী থেকে জীবিত পাঙাশ সংগ্রহ করতেন , নদী থেকে জীবিত পাঙাশ ধরে এনে পুকুরে প্রতিপালন শুরু করেন খলিলুর রহমান। মাছ সংগ্রহের জন্য চাঁদপুর থেকে যেতেন বরিশালের হিজলা পর্যন্ত, খলিলুর রহমান বলছিলেন, ‘দিনের পর দিন ও রাত নদীতে কাটিয়েছি। নিজেই স্পিডবোট বা জাহাজ চালিয়ে নদী থেকে পাঙাশ সংগ্রহ করতাম।’]।

অবশেষে ১৯৯৩ সালের ৮ মে থাইল্যান্ড থেকে আনা পাঙাশের কৃত্রিম প্রজননে (স্ট্রিপিং পদ্ধতি) সফলতা পান তিনি [cite: ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ড থেকে আনা পাঙাশের পোনার কৃত্রিম প্রজননের দায়িত্ব পান খলিলুর রহমান। তিন বছর গবেষণার পর ১৯৯৩ সালের ৮ মে সফল হন তিনি। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সম্ভব হয় থাই পাঙাশের কৃত্রিম প্রজনন]। হ্যাচারিতে পোনা টিকিয়ে রাখতে তিনি দিনের পর দিন খাটে ঘুমিয়ে রাত কাটিয়েছেন [cite: পোনা উৎপাদনের পর সেগুলোকে বাঁচিয়ে বাঁচিয়ে বড় করাই ছিল পরের চ্যালেঞ্জ। হ্যাচারিটি ছিল খোলা জায়গায়। পোনা নষ্ট হয়ে গেলে গবেষণার ফল ধরে রাখা সম্ভব হতো না। তাই সেখানে খাট পেতে রাত কাটাতেন খলিলুর]। তার সেই গবেষণার হাত ধরেই পাঙাশ আজ নিম্ন আয়ের মানুষের আমিষের সাশ্রয়ী উৎসে পরিণত হয়েছে, একসময় সচ্ছল পরিবারের মাছ হিসেবে পরিচিত পাঙাশ উঠে আসে নিম্ন আয়ের মানুষের খাবারের পাতে]।

চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান ভাবনা কর্মজীবনে বহু সাফল্য পেলেও দেশি পাঙাশের পোনা চুরি হওয়া এবং পরবর্তীতে মহাপরিচালক পদ থেকে বঞ্চিত হওয়ার মতো কঠিন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এই বিজ্ঞানী, ২০০৪ সালের ৩০ জুন সেই সাফল্য আসে। কিন্তু চার মাস পর পুকুর থেকে সব পোনা চুরি হয়ে যায়, পরে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে মহাপরিচালক পদে নিয়োগ পেলেও মাত্র ১৫ দিন ওই পদে ছিলেন। তার ভাষায়, দুর্নীতিপরায়ণ নেতৃত্ব তাকে ওই পদে থাকতে দেয়নি]। বর্তমানে তিনি কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের মৎস্য ও জলজসম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন , বর্তমানে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশনের মৎস্য ও জলজসম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করছেন]।

নিরাপদ মাছ উৎপাদনের জন্য শিল্পকারখানার বর্জ্য রোধ, খালের স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখা এবং কৃষির মতো মৎস্য খাতেও ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্লক সুপারভাইজার নিয়োগের সুপারিশ করেছেন তিনি , নিরাপদ মাছ, নিরাপদ পানি: খলিলুর রহমানের মতে, নিরাপদ মাছ উৎপাদনের প্রথম শর্ত নিরাপদ পানি। শিল্পকারখানার বর্জ্যে নদী ও খালের পানি দূষিত হচ্ছে। এ দূষণ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, কৃষিতে ইউনিয়ন পর্যায়ে ব্লক সুপারভাইজার আছেন। মৎস্য খাতেও এ ধরনের জনবল থাকা দরকার বলে মনে করেন তিনি]। তরুণ বিজ্ঞানীদের প্রতি তার পরামর্শ— শুধু এসির ঘরে বসে নয়, মাঠ পর্যায়ে ও পুকুরপাড়ে গিয়ে চাষিদের সমস্যার সমাধান খুঁজতে হবে, নতুন বিজ্ঞানীদের উদ্দেশে খলিলুর রহমান বললেন, গবেষণার মূল লক্ষ্য হতে হবে মানুষের কল্যাণ। শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে গবেষণা করলেই হবে না, মাঠে ও পুকুরপাড়ে গিয়ে চাষিদের সমস্যা বুঝতে হবে]।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment