নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসি) সাম্প্রতিক বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও নানা অনিয়মের প্রেক্ষাপটে নড়েচড়ে বসেছে পুলিশ সদর দপ্তর। অধিকতর বিশ্বাসযোগ্য, সৎ ও আস্থাভাজন ওসি বাছাইয়ের লক্ষ্যে দেশের মোট ৬,৫৩৯ জন পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে গোপন তদন্ত শুরু হয়েছে।
ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট শাখা থেকে এসংক্রান্ত একটি বিশেষ চিঠি পুলিশের সব ইউনিটে পাঠানো হয়েছে। ডিজিটাল মাধ্যম গুগল ফরম লিংক ব্যবহার করে পরিদর্শকদের ব্যক্তিগত তথ্য, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা, বর্তমান ও অতীত কর্মস্থলের বিবরণ এবং পূর্বে কোনো দণ্ড বা শাস্তি পেয়ে থাকলে তার বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের পার্সোনাল ম্যানেজমেন্ট-২ শাখার অতিরিক্ত ডিআইজি আব্দুল্লাহ আল জহির এই চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন।
পুলিশে পরিদর্শক পদের বর্তমান চিত্র
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশ পুলিশে বর্তমানে পরিদর্শকের অনুমোদিত পদ ৬,৯৫৭টি হলেও কর্মরত রয়েছেন ৬,৫৩৯ জন। এর মধ্যে—
-
ইন্সপেক্টর (নিরস্ত্র): ১২৮ জন নারীসহ মোট ৪,৭১৯ জন।
-
ইন্সপেক্টর (টিটি): ৯৮৪ জন।
-
ইন্সপেক্টর (সশস্ত্র): ৮৩৬ জন।
হাইকমান্ডের চরম বিব্রতকর পরিস্থিতি
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় কর্মরত কয়েকজন ওসির বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের ফলে পুলিশের হাইকমান্ড চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে। মাঠপর্যায়ে অভিযান পরিচালনা, মামলা তদন্ত, তদারকি, উদ্ধার অভিযান, দাঙ্গা দমন এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মতো বড় বড় দায়িত্ব পালন করেন এই পরিদর্শকরা। তাদের বলা হয় ‘পুলিশের আয়না’। ফলে তাদের নৈতিক স্খলন বা নেতিবাচক কর্মকাণ্ড পুরো বাহিনীতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ভাবমূর্তি সংকটের সৃষ্টি করে।
গত মঙ্গলবার (গতকাল) পুলিশ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত মাসিক অপরাধ পর্যালোচনা সভাতেও বিভিন্ন থানার ওসিদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা যেকোনো মূলve অধিকতর দক্ষ ও বিতর্কমুক্ত পরিদর্শকদের ওসি পদে পদায়নের জোর সুপারিশ করেন।
যেসব ঘটনায় বিতর্কের ঝড়
সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ঘটনায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে:
-
ক্যান্টনমেন্ট থানা: ওসি রাকিবুল হাসানের ফ্যাসিস্ট সরকারের সহযোগীদের প্রতি আস্থা ও বিভিন্ন নীতি বিষয়ে বিরূপ মন্তব্যের অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তাকে প্রত্যাহার এবং রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
-
শাহ আলী থানা: মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের সঙ্গে যোগসাজশ ও দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে ওসি জাহাঙ্গীর আলমকে প্রত্যাহার করা হয়।
-
গুলশান থানা: গোয়েন্দা তথ্য থাকা সত্ত্বেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের মিছিল প্রতিরোধে ব্যর্থতা ও নমনীয়তা প্রদর্শনের অভিযোগে ওসি দাউদ হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়।
-
সেনবাগ ও অন্যান্য থানা: নোয়াখালীর সেনবাগে আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে ভূরিভোজে অংশ নেওয়ায় ওসি আবদুর রহিম সরকারকে এবং তেজগাঁও, পল্টন মডেল, ফরিদপুর ডিবি ও হাতিরঝিল থানার বিভিন্ন ওসির বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগে তাদের প্রত্যাহার করা হয়। এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধেই কঠোর অবস্থানে গেছে পুলিশ সদর দপ্তর।
ফিটলিস্ট নীতিমালা উপেক্ষিত হওয়ার অভিযোগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিদর্শকদের ওসি পদে পদায়নের নির্দিষ্ট ‘ফিটলিস্ট নীতিমালা’ থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে সঠিকভাবে মানা হচ্ছিল না। বরং তদবির ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ প্রায়ই সামনে আসত।
নীতিমালা অনুযায়ী—আর্থিক অনিয়ম বা নৈতিক স্খলনের কারণে পুরো চাকরিজীবনে গুরুদণ্ডপ্রাপ্ত পরিদর্শকরা ওসি হিসেবে অযোগ্য হবেন, ৫৪ বছরের বেশি বয়সীরা দায়িত্ব পাবেন না এবং ফিটলিস্টভুক্তির জন্য পরিদর্শক পদে ন্যূনতম তিন বছর চাকরির শর্ত থাকতে হবে। তবে নানা অনিয়মের কারণে এই নীতিমালা পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
সাবেক আইজিপিগণের মতামত
পরিদর্শকদের গোপন তদন্ত ও তথ্য সংগ্রহের বিষয়ে সাবেক আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, “শুধু গোপন তদন্ত করে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। মূল বিষয় হলো সঠিক পুলিশ ব্যবস্থাপনা। ফিটলিস্ট নীতিমালা অনুসরণ না করে লটারি বা তদবিরের মাধ্যমে পদায়ন করলে বিতর্ক এড়ানো যাবে না।”
সাবেক আইজিপি নূরুল হুদা মনে করেন, ছয় হাজারের বেশি পরিদর্শকের সবাইকে নিয়ে গোপন তদন্তের চেয়ে নির্দিষ্ট ও সীমিতসংখ্যক পরিদর্শকের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট খোঁজখবর নিয়ে ফিটলিস্ট তৈরি করা হলে তা অধিক ফলপ্রসূ হবে।


