দৈনিক পূর্বাচল বিনোদন
ঢাকা:
ঢালিউডের সোনালী যুগের চলচ্চিত্রে যিনি চোখের ইশারা আর কুটিল হাসিতে পর্দায় ত্রাস সৃষ্টি করতেন, বাস্তবে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ এক ভিন্ন মানুষ—অত্যন্ত মিশুক, হাসিখুশি ও প্রাণোচ্ছ্বল। বলছি বাংলা চলচ্চিত্রের অপ্রতিদ্বন্দ্বী খল অভিনেতা নাসির খানের কথা। প্রায় পাঁচ শতাধিক চলচ্চিত্রে অভিনয় করে যিনি দর্শকের মনে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নেওয়ার পাশাপাশি পর্দার বাইরে সবার প্রিয় ‘মামা’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
জন্ম ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পদার্পণ
১৯৫৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর পিরোজপুর জেলার মঠবাড়িয়া উপজেলার রাজাপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এই গুণী অভিনেতা। তার মূল নাম মো. নাসির দুলাল। ছাত্রজীবনে জগন্নাথ কলেজে (বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) অধ্যয়নকালে তিনি সক্রিয়ভাবে ছাত্র রাজনীতির সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মফস্বল থেকে ঢাকায় এসে নাট্যচর্চা ও কঠোর পরিশ্রমে নিজেকে চলচ্চিত্র জগতের একজন অপরিহার্য খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
অভিনয় জীবন ও জনপ্রিয়তা
১৯৮৫ সালে ‘চোর’ সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় তার অভিষেক ঘটে। এরপর নব্বইয়ের দশকের ঢাকাই সিনেমার ব্যবসাসফল প্রায় প্রতিটি ছবিতেই তার উপস্থিতি ছিল বাধ্যতামূলক। হুমায়ুন ফরীদি, রাজীব ও এটিএম শামসুজ্জামানের ভিড়েও নাসির খান তার শক্তিশালী সংলাপ বলার ভঙ্গি এবং অভিনয়ের স্বকীয়তায় আলাদা পরিচিতি পান।
তার অভিনীত জনপ্রিয় ও ব্যবসা সফল চলচ্চিত্রের তালিকায় রয়েছে—
-
বেদের মেয়ে জোছনা
-
এই ঘর এই সংসার
-
অন্তরে অন্তরে
-
বিক্ষোভ
-
দেনমোহর
-
ভণ্ড সহ বহু স্মরণীয় ছবি।
চলচ্চিত্রে খল চরিত্রে অভিনয় করলেও শিশুতোষ ও ফ্যান্টাসিধর্মী সিনেমাগুলোতে তার সাবলীল অভিনয় ছোটদের কাছেও তাকে দারুণ জনপ্রিয় করে তুলেছিল। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সহ-সভাপতি ও কার্যকরী সদস্য হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ব্যক্তিগত জীবন ও প্রস্থান
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি স্ত্রী মেহেরুন্নেসা স্বপ্না এবং তিন কন্যা—নাছিমা খানম মমতা, ফাহিমা খানম শর্মিতা ও মহিমা খানম নিশিতালে নিয়ে সংসার জীবন কাটিয়েছিলেন। ২০০৭ সালের ১২ জানুয়ারি মাত্র ৪৭ বছর বয়সে এই প্রতিভাবান অভিনেতা না ফেরার দেশে চলে যান। রাষ্ট্রীয় কোনো বড় স্বীকৃতি না পেলেও সাধারণ মানুষের ভালোবাসা আর স্মৃতির মণিকোঠায় তিনি অমর হয়ে আছেন। বাসভবনসংলগ্ন গলিটি ভক্তরা ভালোবেসে নামকরণ করেছেন ‘নাসির খানের গলি’। ঢাকাই সিনেমার ইতিহাসে খলঅভিনয়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন।


