অন্যান্য

শ্রীমঙ্গলে সর্বনাশা অনলাইন জুয়ার বিস্তার: নিঃস্ব হচ্ছে যুবসমাজ, ঝরছে প্রাণ

বিশেষ প্রতিবেদক, শ্রীমঙ্গল:

মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে দিন দিন মহামারী আকারে বাড়ছে অনলাইন জুয়ার বিস্তার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লোভনীয় বিজ্ঞাপন, পরিচিতজনের প্ররোচনা কিংবা অল্প সময়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার অবাস্তব আশায় সর্বস্ব হারাচ্ছেন এলাকার বিভিন্ন বয়সের মানুষ। শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবী থেকে শুরু করে দিনমজুর ও সিএনজিচালকরাও জড়িয়ে পড়ছেন এই সর্বনাশা নেশায়। জুয়ার জেরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পারিবারিক অশান্তি, মানসিক বিপর্যয় এমনকি আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে।

ক্যামেরার টাকা জুয়ায় হারিয়ে তরুণের আত্মহত্যা

শ্রীমঙ্গল পৌর শহরের পূর্বাশা আবাসিক এলাকার ভাড়াবাসার বাসিন্দা ও পেশাদার ভিডিওগ্রাফার তন্ময় গোস্বামী। মৃত্যুর মাত্র তিন মাস আগে ভালোবেসে জীবনসঙ্গী বেছে নিয়েছিলেন তিনি। গত ২১ জুলাই ধারদেনা করে জোগাড় করা প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ হাজার টাকা নিয়ে নতুন ক্যামেরা কিনতে বের হন তন্ময়। কিন্তু রাতে বাসায় ফেরেন খালি হাতে। স্বজনদের ভাষ্যমতে, ক্যামেরা কেনার সেই পুরো টাকা অনলাইন জুয়ায় হেরে যান তিনি। পরদিন ২২ জুলাই ঋণের চাপ ও তীব্র মানসিক অস্থিরতা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন এই তরুণ।

তন্ময়ের মামা সিমন কৈরী জানান, মা ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছ থেকে ঋণ করে ক্যামেরা কেনার টাকা তুলেছিলেন তন্ময়। কিন্তু জুয়ায় তা হারিয়ে ঋণের বোঝা বাড়ায় মানসিক চাপে সে প্রাণ বিসর্জন দেয়। তন্ময়ের বাবা উত্তম গোস্বামী আক্ষেপ করে বলেন, ‘দিনে দিনে যুবসমাজ ধ্বংসের পথে যাচ্ছে। আমার ছেলের মতো যেন আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়।’

ঋণের টাকা এক রাতেই শেষ, ঝরল আরও প্রাণ

অনলাইন জুয়ার সর্বগ্রাসী ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছেন না সরকারি চাকরিজীবীরাও। ‘সবুজ’ (ছদ্মনাম) নামের এক সরকারি চাকরিজীবী গত এক বছর ধরে অনলাইন জুয়ায় আসক্ত হয়ে পড়েন। একটি এনজিও থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে তার পুরোটাই এক রাতে অনলাইন জুয়ায় উড়িয়ে দেন তিনি। পরে অর্থনৈতিক ও পারিবারিক চরম চাপে গত ১০ ফেব্রুয়ারি তিনিও আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শ্রীমঙ্গলে ‘লাকি বাজ’, ‘নায়া লুডু’, ‘আগুন বাজি’, ‘ভেলকি গেমস’, ‘সিকে৪৪৪’, ‘সিভি৬৬৬’, ‘সিভি৪৪৪’, ‘নগদ৮৮’ ও ‘ক্রিক্রিয়া’র মতো প্রায় ১৫ থেকে ২০টি অ্যাপ ও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই রমরমা জুয়া চলছে। রাত ১২টা থেকে ভোর পর্যন্ত এসব অ্যাপে তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে যায়। নামমাত্র ১০ টাকা থেকে শুরু করে একবারে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত বাজি ধরছেন আসক্তরা। গ্রাহক টানতে ব্যবহার করা হচ্ছে ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ও হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ।

টাকার দ্বন্দ্বে খুন কলেজছাত্র

শুধু আত্মহত্যাই নয়, জুয়ার টাকা নিয়ে তৈরি হওয়া বিরোধের জেরে ঘটেছে খুনের মতো অপরাধও। কলেজছাত্র হৃদয় মিয়া জড়িয়ে পড়েছিল অনলাইন জুয়ায়। বন্ধুর কাছ থেকে ২২ হাজার টাকা ধার নিয়ে জুয়া খেলে তা হেরে যান তিনি। নির্ধারিত সময়ে সেই টাকা ফেরত দিতে না পারায় বন্ধুদের সঙ্গে সৃষ্টি হয় রক্তক্ষয়ী বিরোধ। এর জেরে গত বছরের ৭ জুলাই নৃশংসভাবে খুন হন হৃদয়।

মোবাইল ব্যাংকিংয়ে রমরমা লেনদেন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান

অনলাইন জুয়ার অবৈধ আর্থিক লেনদেনে ব্যবহার করা হচ্ছে বিকাশ ও নগদের মতো মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (MFS)। অনেক গ্রাহক নিয়মিতভাবে ১০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্যাশ-ইন করছেন বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বিকাশের হেড অব করপোরেট কমিউনিকেশনস কর্মকর্তা শামসুদ্দিন হায়দার ডালিম জানান, সন্দেহজনক লেনদেনের প্রতিবেদন স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) পাঠানো হয়। অনলাইন জুয়াসহ যেকোনো অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধে তাদের নিয়মিত কঠোর তদারকি অব্যাহত রয়েছে।

গত ৩ জুলাই রাতে শ্রীমঙ্গল উপজেলার টিকরিয়া গ্রামের একটি মুদি দোকানে অভিযান চালিয়ে চারটি মোবাইল ফোনসহ চারজন অনলাইন জুয়াড়িকে হাতেনাতে আটক করে র‍্যাব। এই ঘটনায় স্থানীয় সচেতন মহলে উদ্বেগ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।

প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন ও সম্মিলিত প্রতিরোধ

শ্রীমঙ্গল থানার ওসি সরকার আব্দুল্লাহ আল মামুন ‘দৈনিক পূর্বাচল’-কে জানান, অনলাইন জুয়ার অ্যাপ, সামাজিক মাধ্যমের প্রচারণা এবং এর সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিকেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, ‘শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চালিয়ে অনলাইন জুয়ার এই ভয়ংকর বিস্তার পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও সমাজের প্রতিটি সচেতন নাগরিককে এগিয়ে এসে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment