অন্যান্য

রিফাত হত্যা মামলা: কনডেম সেলে মানবেতর দিন কাটছে মিন্নির | দৈনিক পূর্বাচল

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল/বরগুনা

৯ অক্টোবর, ২০২৬বরগুনার রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির উচ্চ আদালতে আপিল শুনানি ও বরিশাল কারাগারের কনডেম সেলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে দৈনিক পূর্বাচলের বিশেষ প্রতিবেদন।

বরগুনার বহুল আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়ার পর থেকেই বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের কনডেম সেলে কাটছে আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির বন্দিজীবন। উচ্চ আদালতে ডেথ রেফারেন্স ও আপিল শুনানির দীর্ঘসূত্রতার কারণে চূড়ান্ত রায় ঝুলে থাকায়, ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন পার করছেন তিনি।

মামলার নেপথ্য ও বিচারিক আদালতের রায়

২০১৯ সালের ২৬ জুন বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করা হয় রিফাত শরীফকে। এই চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের পর দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে নিহতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেন।

রায়ের ঠিক চার দিন পর, ২০২০ সালের ৪ অক্টোবর মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) নথিপত্র হাইকোর্টে আসে। একই সময়ে দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে মিন্নিসহ অন্যান্য আসামিরাও পৃথক আপিল করেন। তবে অসুস্থতাসহ নানা আইনি যুক্তিতে জামিন আবেদন করা হলেও তা কার্যত শুনানির অপেক্ষায় ঝুলে রয়েছে।

উচ্চ আদালতে জট ও আইনি জটিলতা

সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে আদালতটিতে ১ হাজার ২৬৫টি ডেথ রেফারেন্স শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে, যার জট দিন দিন বাড়ছে। সংশ্লিষ্ট আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সৈয়দ ইজাজ কবির জানান, বর্তমানে ২০১৯ সালের ডেথ রেফারেন্সগুলোর শুনানি চলছে। এর ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালের রিফাত হত্যা মামলার নথির বর্তমান অবস্থা যাচাই করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বিচারিক আদালত থেকে আপিল বিভাগ পর্যন্ত একটি মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায়। তবে আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই কোনো আসামিকে বছরের পর বছর কনডেম সেলের মতো নির্জন কুঠুরিতে আটকে রাখা মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী। কারণ, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্ত করা যায় না।

মিন্নির আইনজীবী ও পরিবারের বক্তব্য

মিন্নির আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না জানান, সাক্ষীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, শারীরিক অসুস্থতা এবং নারী বন্দি হিসেবে বিবেচনা করে ২০২২ সালের অক্টোবরে হাইকোর্টে জামিনের আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্ট বেঞ্চের অপারগতা এবং পরবর্তী বেঞ্চে শুনানির সময় পেছানোর কারণে বিষয়টি আর কার্যতালিকায় ওঠেনি।

অন্যদিকে, মিন্নির বাবা মোজাম্মেল হোসেন কিশোরের অভিযোগ, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র গভীর ষড়যন্ত্র করে তার মেয়েকে এই হত্যা মামলায় ফাঁসিছে। মেয়ের চরম শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টি মানবিক দিক থেকে বিবেচনা করে অন্তর্বর্তীকালীন জামিনের জোড় দাবি জানিয়েছেন তিনি।

কনডেম সেলে মিন্নির দিনকাল

কারা সূত্র জানিয়েছে, বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগারের একমাত্র নারী বন্দি হিসেবে কনডেম সেলে দিন কাটাচ্ছেন মিন্নি। কারাবিধি অনুযায়ী তিনি দুই সেট পোশাক পেয়েছেন এবং নির্ধারিত সেলের বাইরে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মাসে মাত্র একবার স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সপ্তাহে একবার সীমিত সময়ের জন্য পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলার সুযোগ পান তিনি। মানসিকভাবে ধীরস্থির ও শান্ত প্রকৃতির মিন্নি কনডেম সেলে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় এবং ইবাদত-বন্দেগির মধ্য দিয়েই তাঁর অধিকাংশ সময় কাটাচ্ছেন।

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment