দৈনিক পূর্বাচল
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
রাজধানীসহ সারাদেশে বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় পঙ্গুত্ব বরণ করছেন সাধারণ মানুষ। পঙ্গু হাসপাতালের মর্মান্তিক চিত্র নিয়ে দৈনিক পূর্বাচলের বিশেষ প্রতিবেদন।
একটি অনিয়ন্ত্রিত যান, আর মাত্র কয়েক সেকেন্ডের বেপরোয়া গতি—তাতেই নিমিষে তছনছ হয়ে যাচ্ছে একটি পরিবারের হাসি-খুশি জীবন। প্রতিদিন রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অননুমোদিত ও বেপরোয়া ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ধাক্কায় পঙ্গুত্ব বরণ করছেন শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত নানা বয়সের মানুষ। হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রতিনিয়ত বাড়ছে অঙ্গ হারানো এসব ভুক্তভোগীর আহাজারি।
এমনই এক নির্মম বাস্তবতার শিকার ৭৬ বছর বয়সী বৃদ্ধ রওশন আলী। জীবনের শেষ ভাগে এসে যেখানে স্বজনদের ছায়া হয়ে শান্তিতে থাকার কথা ছিল, সেখানে অনিয়ন্ত্রিত অটোরিকশার ধাক্কায় আজ তিনি সম্পূর্ণ পরনির্ভরশীল।
চিকিৎসকদের প্রাণপণ চেষ্টায় তার জীবন বাঁচলেও কেটে ফেলতে হয়েছে ডান পা। জীবনের জমানো সব সঞ্চয় চিকিৎসার পেছনে ঢেলে দিয়েও আর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হয়নি তার।
সরেজমিনে রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানে (পঙ্গু হাসপাতাল) ঘুরে দেখা যায়, বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া রওশন আলী একরাশ হতাশা নিয়ে চেয়ে আছেন শূন্যতার দিকে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমি একসময় সফল ব্যবসায়ী ছিলাম। কিন্তু এই দুর্ঘটনার পর চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে আমার সব টাকা-পয়সা শেষ হয়ে গেছে। এখন আমি একপ্রকার পথের ভিখারি। আপনারা যদি এই বেপরোয়া অটোরিকশা বাতিল করেন, তবে আর দশটা মানুষ বেঁচে যাবে।”
শয্যায় শয্যায় হাজারো মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি
কেবল রওশন আলীই নন, পঙ্গু হাসপাতালের প্রতিটি শয্যায় ঝুলছে এমন হাজারো ট্র্যাজেডি। একটু এগোতেই চোখে পড়ে পাঁচ বছরের শিশু আবদুল্লাহ ফাহাদের নিদারুণ যন্ত্রণার দৃশ্য। হাতে খাবার কেনার টাকা নিয়ে রাস্তা পার হওয়ার সময় বেপরোয়া গতির একটি অটোরিকশা তাকে পিষে দিয়ে যায়। শিশুটির বাবা চোখে জল নিয়ে জানান, পকেটের ১০টি টাকা নিয়ে দোকানে যাওয়ার পথেই মর্মান্তিক এই দুর্ঘটনা ঘটে। এখন ব্যথায় হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে নিষ্পাপ শিশুটি।
একই হাসপাতালে জীবনের স্বপ্ন চুরমার হয়ে যাওয়া মাসুদ রানার গল্পটাও হৃদয়বিদারক। নতুন চাকরির সন্ধানে সাভারে যাওয়ার পথে একটি নিয়ন্ত্রণহীন অটোরিকশা তাকে রাস্তার পাশে থাকা বৈদ্যুতিক খুঁটি ও দেয়ালের মাঝে সজোরে চেপে ধরে।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় মাসুদ রানা বলেন, “গাড়িটা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে আমাকে সোজা দেয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে। এখন পর্যন্ত চিকিৎসার পেছনে ৫০ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে, কিন্তু শারীরিক কোনো উন্নতি হচ্ছে না। কাজ বন্ধ, আয়-রোজগারও সম্পূর্ণ বন্ধ।”
বিশেষজ্ঞের মতামত ও শঙ্কা
যোগাযোগ ও পরিবহণ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, “একটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একজন ব্যক্তির শরীরেই আঘাত হানে না; বরং পুরো পরিবারকে ঠেলে দেয় এক অনিশ্চিত অন্ধকারে। একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি পঙ্গু হয়ে পড়লে পরিবারের চাকা থমকে যায়, আর চিকিৎসার আকাশছোঁয়া খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক পরিবার এক লহমায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে।”
বিশ্লেষকদের মতে, অনিয়ন্ত্রিত ও লাইসেন্সবিহীন এসব যান চলাচলে দ্রুত কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না নিলে রাজধানীসহ দেশের সড়কে মৃত্যুর মিছিল এবং পঙ্গুত্বের দীর্ঘশ্বাস আরও প্রলম্বিত হবে।


