আন্তর্জাতিক

সৌদি আরব থেকে দেশে ফেরার আকুতি হবিগঞ্জের গৃহবধূর

নিজস্ব প্রতিবেদক | 

প্রকাশিত: ৪ অক্টোবর, ২০২৬

সৌদি আরবে গৃহকর্মীর কাজ করতে গিয়ে চরম অমানবিক নির্যাতন ও বিপাকে পড়া হবিগঞ্জের মাধবপুরের এক গৃহবধূ রেহেনা খাতুন দেশে ফেরার আকুতি জানিয়েছেন। তাকে উদ্ধার করে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আকুল আবেদন জানানো হয়েছে। বর্তমানে সৌদিতে অবস্থানরত তার বোন হেনা বেগম ‘আগামীর সময়’-এর মাধ্যমে এই মর্মে একটি ভিডিওবার্তা পাঠিয়ে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন।

রেহেনা খাতুন মাধবপুর উপজেলার ২নং চৌমুহনী ইউনিয়নের কমলপুর গ্রামের কোনাবাড়ী মহল্লার বাসিন্দা আলী আহমদের স্ত্রী।

যেভাবে সৌদি আরব যান রেহেনা

পরিবারের অভিযোগ, তীব্র অভাব-অনটনের কারণে প্রায় দুই মাস আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার লালপুর (মোকন্দপুরের বামুটিয়া) গ্রামের গিয়াস উদ্দিন নামক এক দালালের মাধ্যমে গৃহকর্মীর ভিসায় সৌদি আরবে যান রেহেনা। বর্তমানে তিনি জেদ্দার আলহাদা এলাকায় একটি বাসাতে গৃহকর্মী হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।

সৌদিতে অবস্থানরত রেহেনার বোন হেনা বেগমের দাবি, সেখানকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে ১৬ হাজার রিয়ালের বিনিময়ে রেহেনাকে ওই বাসায় কাজ দেওয়া হয়েছে। সেখানে তাকে দিয়ে অতিরিক্ত কাজ করানো হচ্ছে এবং সময়মতো খাবার দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন রাখতে তাকে কোনো ইন্টারনেট সংযোগও দেওয়া হচ্ছে না। পরবর্তীতে অত্যন্ত কৌশলে রেহেনার কাছ থেকে একটি ভিডিওবার্তা সংগ্রহ করে তা সংবাদমাধ্যমের কাছে পাঠান হেনা।

ভিডিওবার্তায় রেহেনার আকুতি ও এজেন্সি অসাধুতা

ভাইরাল হওয়া ওই ভিডিওবার্তায় গৃহবধূ রেহেনা খাতুন কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, তিনি সৌদি আরবের এজেন্সি অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু দেশে পাঠানোর জন্য এজেন্সি তার কাছে সাড়ে তিন লাখ টাকা দাবি করেছে, যা দরিদ্র পরিবারের পক্ষে দেওয়া কিছুতেই সম্ভব নয়।

এজেন্সির চরম অমানবিক আচরণের কথা উল্লেখ করে রেহেনা বলেন, এজেন্সি অফিসের লোকজন তাকে সাফ জানিয়েছে— “আমি তোমাকে বিক্রি করে দিয়েছি। এরপর আর কোনো দায়িত্ব আমি নিতে পারব না।”

ভিডিওতে তিনি আরও বলেন, “আমি জীবন-মরণের সন্ধিক্ষণে রয়েছি। আমাকে নানামুখী মানসিক ও শারীরিক চাপ দেওয়া হচ্ছে। আমি খুবই অসুস্থ, মনে হয় আর বাঁচব না। আমাকে কোনো বেতন-ভাতা দেওয়া হচ্ছে না। আমি বাংলাদেশ সরকারের কাছে আকুতি জানাই, দয়া করে আমাকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।”

স্বামী ও সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

কান্নাজড়িত কণ্ঠে রেহেনার স্বামী আলী আহমদ বলেন, “বাংলাদেশি দূতাবাসের কাছে আমার আকুল আবেদন, দয়া করে আমার স্ত্রীকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনুন।”

তবে অভিযুক্ত দলাল গিয়াস উদ্দিনের দাবি, “কিছু খরচাপাতি দিলে তাকে আনিয়ে দেব। সৌদি আরব গেলেই তো হুট করে চলে আসা যায় না।”

এদিকে ঢাকার ফকিরাপুলের সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি ‘জেনিয়া ওভারসিস’-এর কর্মকর্তা হাসান মিয়া গৃহবধূর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “ওই নারী কোনো নির্যাতনের শিকার হননি। দেশে ফিরতে হলে আমাদের যাতায়াত খরচ দিতে হবে। তার শারীরিক অবস্থা খারাপ হলে আমাদের কিছু করার নেই।”

প্রশাসনের পদক্ষেপ

রেহেনাকে নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা এবং এই মানবপাচার ও প্রতারণার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে তার স্বামী ইতোমধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছেন।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের উপসহকারী পরিচালক মালেকা বেগম জানান, “যেহেতু আমাদের কাছে আবেদন এসেছে, আমরা বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে সৌদিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসে পাঠিয়ে খোঁজখবর নেব। গৃহবধূকে উদ্ধারের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় চেষ্টা চালানো হবে।”

About the author

নিজস্ব প্রতিবেদক

Leave a Comment