দৈনিক পূর্বাচল
নিজস্ব প্রতিবেদক
ক্ষমতার সঙ্গে পদ-পদবির দাপট দেখিয়ে অনিয়ম ও অপরাধে জড়ালে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না—এমন কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলের মন্ত্রী, এমপি কিংবা শীর্ষ পর্যায়ের নেতা হোন না কেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ মিললে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে আইনি শাস্তি নিশ্চিত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি।
বিশেষ করে মিরপুরের ঐতিহ্যবাহী রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় দলীয় নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠার পর এই অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে। দল ও সরকারকে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে রাখতে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সরাসরি নির্দেশে এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়িত হচ্ছে।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বর্বরোচিত হামলা ও ক্ষোভ
গত ২৫ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুরের দরিদ্র মা ও শিশুদের প্রায় পাঁচ দশকের আস্থার প্রতীক রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দুই শতাধিক সন্ত্রাসী হামলা চালায়। নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম লুট এবং ভারী যন্ত্র দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের স্থায়ী ও আধাপাকা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে ফিরে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। প্রাথমিক তদন্তে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদ্য বিলুপ্ত কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক ও সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টির সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়।
মাত্র ৫ মাসের মাথায় এমপি পদ হারালেন মিষ্টি
তদন্তে প্রাথমিক সত্যতা মেলায় গত বুধবার রাতে সংসদ সদস্য পদ থেকে ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। সরকারপ্রধানের সেই নির্দেশ অনুযায়ী বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় স্পিকারের কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। এর মাধ্যমে গত মে মাসে শপথ নেওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় সংসদ সদস্য পদ হারালেন তিনি। যদিও মিষ্টি শুরু থেকেই এই হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, পুলিশের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী তার বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল ও যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
ভেঙে দেওয়া হলো একাধিক কমিটি ও ডজনখানেক বহিষ্কার
শুধু সংসদ সদস্য পদত্যাগেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখেনি দলটি। দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও গার্মেন্ট নিয়ন্ত্রণ রোধে গত বুধবার বড় ধরনের সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে—
-
ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৫১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
-
ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদল ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।
-
দল ও অঙ্গসংগঠনের ডজনখানেক নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
‘অপরাধী যে-ই হোক, ছাড় দেওয়া হবে না’
এ বিষয়ে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “বিএনপি সবসময় অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখে, দলীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হয় না। অতীতে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে যেভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার করা হয়েছে, আমাদের দলে তার বিন্দুমাত্র স্থান নেই। রাড্ডা কাণ্ডের পর গৃহীত পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সন্ত্রাস দমনের অঙ্গীকারই প্রতিফলিত হয়েছে।”
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী ও বিএনপি নেতা রাশেদ খান স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বিএনপি কোনো অপরাধীকে বিন্দুমাত্র প্রশ্রয় দেয় না। অন্যদিকে ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক কাজী ছাইয়েদুল আলম বাবুল জানিয়েছেন, দলের যেকোনো স্তরের নেতাকর্মীর অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক বার্তা ইতিমধ্যে দেশের প্রতিটি তৃণমূলে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।


